কারাবন্দী ফিলিস্তিনি নেতা মারওয়ান বারঘুতির লেখা নিয়ে আসছে 'আনব্রোকেন' বই
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতা মারওয়ান বারঘুতির লেখার সংগ্রহ নিয়ে এ বছরের নভেম্বরে একটি বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। 'আনব্রোকেন: ইন পারস্যুট অব ফ্রিডম ফর প্যালেস্টাইন' শিরোনামের এই বইটিতে বারঘুতির রাজনৈতিক জীবন, কারাবাসের সময় লেখা চিঠি, সাক্ষাৎকার এবং ব্যক্তিগত জীবনের গল্প বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। প্রকাশক পেঙ্গুইন জানিয়েছেন, বইটি ৫ নভেম্বর প্রকাশ করা হবে।
বারঘুতির রাজনৈতিক পথ ও কারাবাস
মারওয়ান বারঘুতি ২০০২ সালে রামাল্লায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী রয়েছেন। গ্রেপ্তারের সময় তিনি ফিলিস্তিনি আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ইসরায়েলি আদালত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত থাকা ও 'সন্ত্রাসবাদের' অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেয়। তবে বারঘুতি এই অভিযোগগুলো ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপার্লামেন্টারি ইউনিয়ন এই বিচারের সমালোচনা করে বলেছিল, এতে জেনেভা কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে।
বারঘুতি হামাসের প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতাহ দলের সদস্য এবং দীর্ঘদিন ধরে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে কথা বলছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তিনি ফিলিস্তিনিদের জন্য শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন, যা ইসরায়েলের জন্য উদ্বেগের কারণ। ১৯৫৯ সালে পশ্চিম তীরের কোবার গ্রামে জন্মগ্রহণকারী বারঘুতি ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর ইসরায়েলি সামরিক দখলদারত্বের অধীনে বেড়ে ওঠেন। তিনি কিশোর বয়স থেকেই রাজনৈতিক সক্রিয়তার জন্য একাধিকবার গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি ঐক্যের পক্ষে ভূমিকা রাখেন।
বইটিতে কী থাকবে?
আসন্ন বইটিতে বারঘুতির পরিবারের কাছে কারাগার থেকে লেখা ব্যক্তিগত চিঠি, জনসাধারণকে লেখা চিঠিপত্র, প্রেস সাক্ষাৎকার, জনসাধারণের বিবৃতি, ঐতিহাসিক নথি ও ছবি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়াও, তাঁর বই '১০০০ ডেজ ইন সলিটারি কনফাইনমেন্ট' থেকে কিছু অংশ সংগ্রহ করা হবে, যা এখন পর্যন্ত কেবল আরবি ভাষায় পাওয়া যায়। বারঘুতি দীর্ঘ সময় নির্জন কারাগারে কাটিয়েছেন, যেখানে তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দীদের মতে, কারাগারে তাঁকে একাধিক গুরুতর নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তিনি তিন বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেননি এবং তাঁর আইনজীবীদেরও দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ইসরায়েল আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটিকেও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হয়।
জনপ্রিয়তা ও মুক্তির দাবি
দুই দশকের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা সত্ত্বেও ধারাবাহিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, বারঘুতি গাজা ও পশ্চিম তীরের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ। তাঁকে দলীয় বিভাজনের মধ্যে একজন সম্ভাব্য ঐক্যবদ্ধ নেতা হিসেবে দেখা হয় এবং অনেকে তাঁকে 'ফিলিস্তিনের ম্যান্ডেলা' হিসেবে অভিহিত করেন। নামমাত্র যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন অব্যাহত থাকলেও, ৬৬ বছর বয়সী বারঘুতিকে অনেকেই ভবিষ্যতের যেকোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্য সেরা নেতা হিসেবে বিবেচনা করেন।
তাঁর মুক্তির দাবিতে লন্ডনসহ ইউরোপের নানা শহর, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে বিশ্বের ২০০ জনের বেশি শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর মুক্তির আহ্বান জানিয়ে একটি খোলাচিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। এই বইটি প্রকাশের মাধ্যমে বারঘুতির জীবন ও সংগ্রাম সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
