মাতৃত্ব মা ও শিশু তিনি শুধু একজন মা ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক নিঃশব্দ বিপ্লব। গ্রামের ধুলোমাখা উঠোন থেকে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন মানুষের পাশে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে, কুশিক্ষার অন্ধকারের বিরুদ্ধে। যখন চারদিকে ছিল ভয়, অভাব, অনিশ্চয়তা আর অবহেলা, তখন তিনি শিখিয়েছিলেন একজন মায়ের শক্তি কত বড় হতে পারে। তিনি বলতেন, ‘সন্তানকে শুধু বড় করলেই হয় না, মানুষ করতে হয়।’
১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা দিন
১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে তিনি দেখেছিলেন একটি জাতির জন্ম। আর সেই সময় থেকেই নিজের ঘরের সন্তানদের মাঝেও স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, গ্রামবাংলার কাঁচা মাটির ঘর থেকেও জন্ম নিতে পারে বিজ্ঞানী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশ্বমানের নাগরিক। তিনি কোনো বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন না, কোনো রাষ্ট্রীয় পদকও পাননি, কিন্তু তাঁর জীবন ছিল এক চলমান বিদ্যালয়।
গ্রামের নারীদের শিক্ষা
গ্রামের নারীদের তিনি বুঝিয়েছেন মাতৃত্ব মানে শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া নয়, মাতৃত্ব মানে চরিত্র গড়া, সাহস শেখানো, মানুষকে আলোকিত করা। ব্রিটিশ শাসনের ছায়ায় জন্ম নেওয়া সেই নারী পাকিস্তানি বৈষম্যের সময় পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিলেন। তিনি জানতেন, একটি শিক্ষিত মা একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। নয়টি সন্তানকে তিনি বড় করেছেন অক্লান্ত শ্রমে, অসীম ধৈর্যে, অদম্য বিশ্বাসে। তিনি প্রমাণ করেছেন, বাংলার মায়েরা চাইলে বিশ্বের প্রথম সারির নাগরিক তৈরি করতে পারেন। একটি গ্রামের মা বিশ্বকে আলোকিত করার স্বপ্ন দেখাতে পারেন।
মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক
আমার আর মায়ের সম্পর্ক আজকের নয়, এটি বহু বছরের জমে থাকা নিঃশব্দ ভালোবাসার ইতিহাস। শৈশবের হাত ধরা পথ থেকে জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন আমার সাহস, আমার প্রথম বিদ্যালয়, আমার পৃথিবীকে দেখার জানালা। তারপর একদিন জীবনের প্রয়োজনে আমি হয়ে গেলাম দূর পরবাসী। বাংলার মাটির গন্ধ পেছনে ফেলে উত্তরের শীতল দেশে নতুন জীবন গড়ার সংগ্রাম শুরু হলো। কিন্তু দূরত্ব কখনো মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ককে ভাঙতে পারেনি। হাজার মাইল দূরে থেকেও ফোনের ওপারে তাঁর কণ্ঠ শুনলেই মনে হতো আমি এখনো সেই গ্রামের সন্তান, যার জন্য মা রাত জেগে দোয়া করেন।
প্রবাসজীবনে মায়ের ভালোবাসা
প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছরের প্রবাসজীবনে মায়ের ভালোবাসাই ছিল আমার শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ। আর তাঁর জীবনের শেষ পনেরো বছরে বাংলাদেশ আর সুইডেনের মাঝখানে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমার দুই পৃথিবীর নীরব সেতুবন্ধন। আমার নতুন দেশের প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল তাঁর আশীর্বাদ, ছিল তাঁর বিশ্বাস, ছিল তাঁর নীরব উপস্থিতি।
মায়ের শেষ বিদায়
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরের এক নীরব দিনে তিনি পৃথিবীর দায়িত্ব শেষ করে চলে গেছেন অনন্তের পথে। এখন তিনি ঘুমিয়ে আছেন সুইডেনের লিনশোপিং শহরের স্লাকা গ্রামের একটি শান্ত মুসলিম কবরস্থানে। তবুও আমি জানি, তিনি হারিয়ে যাননি। কারণ, সন্তানের হৃদয়ে মায়েরা কখনো মারা যান না। সফলতার আনন্দে, নিঃসঙ্গ রাতের নীরবতায়, অচেনা শহরের ভিড়ে, আজও আমি অনুভব করি তিনি ঠিক পাশে আছেন। যেন দূর আকাশের ওপার থেকে এখনো বলছেন, ‘মানুষের মাঝে তুমি মানুষ হয়ে বেঁচে থেকো, বাবা।’
মা দিবসের তাৎপর্য
মা দিবস শুধু একটি দিন নয়, এটি সেই মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতা যিনি নিজের জীবন নিঃশেষ করে সন্তানের ভবিষ্যৎ আলোকিত করেন। আজকের পৃথিবীতে যখন মানুষ পরিচয় খুঁজে ফেরে ক্ষমতায়, সম্পদে, বাহ্যিক সাফল্যে, তখন আমি গর্ব করে বলতে চাই, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমি একজন বাংলার মায়ের সন্তান। পৃথিবী জানুক, বাংলার মায়েরা শুধু সন্তান জন্ম দেন না, তাঁরা ইতিহাসও গড়েন। আমার মায়ের জীবনই ছিল তার এক নীরব প্রমাণ। আর পৃথিবীর বহু অজানা সাফল্যের পেছনে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন বাংলার মা। হয়তো কাঁচা মাটির ঘরে বসে সন্তানের জন্য ভাত তুলে দিচ্ছেন, হয়তো গভীর রাতে অন্ধকারের মধ্যে হাত তুলে দোয়া করছেন, হয়তো নিজের স্বপ্নগুলো নিঃশব্দে সরিয়ে রেখে সন্তানের ভবিষ্যৎ আলোকিত করছেন। পৃথিবী অনেক মহান মানুষের নাম মনে রাখে, কিন্তু তাদের পেছনে থাকা মায়ের নীরব ত্যাগের ইতিহাস খুব কম মানুষই লিখে রাখে।
লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।



