চাঁদে ফের মানুষের পদচিহ্ন
গত এপ্রিলে চাঁদের উদ্দেশে পাড়ি জমানো আর্টেমিস–২ মিশনের ১০ দিনের সফল চন্দ্রাভিযান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক অনন্য মাইলফলক। সর্বশেষ চাঁদে নভোচারী গিয়েছিল ১৯৭২ সালে। সেই অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এবারই প্রথম মানুষ চাঁদে অভিযান পরিচালনা করেছে।
নতুন এই মহাকাশ অভিযানের পেছনে বড় হয়ে উঠেছে ভূরাজনীতি, যা বিশ শতকের সোভিয়েত-আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধের কথাই মনে করিয়ে দেয়। মহাকাশকে ঘিরে এই উন্মাদনা যদি এখনই নতুন কোনো আন্তর্জাতিক নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা না যায়, তবে তা মানবজাতির জন্য এক চরম ও প্রাণঘাতী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
প্রতিযোগিতায় বহু দেশ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান
বর্তমান এই মহাকাশ অভিযানের প্রতিযোগিতায় আগের চেয়ে অনেক বেশি দেশ যুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার পাশাপাশি মহাকাশ অভিযানের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে কানাডা, চীন, ভারত, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। দেশগুলোর পাশাপাশি স্পেসএক্স, ব্লু অরিজিন, বোয়িংয়ের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও মহাকাশ অভিযানের দৌড়ে শামিল হয়েছে।
সবাই চাঁদে পৌঁছাতে বেশ মরিয়া। চাঁদের বুকে লুকিয়ে আছে অমূল্য সম্পদ পানি ও হিলিয়াম-৩। এই পানি ও হিলিয়াম-৩ ভবিষ্যতে মহাকাশযানের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে যার হাতে এই সম্পদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, কৌশলগতভাবে সে–ই পুরো পৃথিবীর ওপর ছড়ি ঘোরাবে। এ জন্যই চলছে নতুন প্রতিযোগিতা।
মহাকাশ নির্ভরতা ও বিপদ
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ক্যাসান্ড্রা স্টিয়ার বলেন, ‘পৃথিবীতে আমাদের দৈনন্দিন জীবন এখন পুরোপুরি মহাকাশের ওপর নির্ভরশীল। আবহাওয়া পরীক্ষা করা থেকে শুরু করে ফোনে পোশাক কেনাসহ প্রতিটি কাজে আমরা স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্য নিচ্ছি। কিন্তু মহাকাশে স্যাটেলাইটের ভিড় এবং মহাজাগতিক বর্জ্য যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তবে কক্ষপথে এক প্রলয়ংকরী সংঘর্ষের সৃষ্টি হবে। এর ফলে অচল হয়ে পড়তে পারে পৃথিবীর পুরো যোগাযোগব্যবস্থা।’
একই সঙ্গে আধুনিক সামরিক বাহিনীও নেভিগেশন এবং যোগাযোগের জন্য স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে স্যাটেলাইট ধ্বংসের মতো ঘটনা মহাকাশ যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে, যা পুরো কক্ষপথকে মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী করে তুলবে।
নতুন নিয়মের প্রয়োজনীয়তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৬৭ সালের ঐতিহাসিক আউটার স্পেস চুক্তিতে মহাকাশকে সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত এবং কেবল শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল। তবে একবিংশ শতাব্দীর এই জটিল প্রেক্ষাপটে সেই চুক্তিকে একটি সংবিধান হিসেবে ধরে নিয়ে তার অধীনে নতুন ও কঠোর উপ-আইন তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই নিয়ম তৈরির কাজটি কেবল রাজনৈতিকভাবে অস্থির রাষ্ট্রগুলোর ওপর কিংবা স্বার্থান্বেষী বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। এর জন্য জাতিসংঘ, ন্যাটো বা কোয়াডের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সবার ভূমিকা
আমরা প্রত্যেকেই আসলে একেকজন মহাকাশ নাগরিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো মহাকাশের সুরক্ষায়ও এখন সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও নাগরিক সমাজকে ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের স্বার্থেই মহাকাশকে একটি নিরাপদ ও যুদ্ধমুক্ত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।



