মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি-আমিরাতের নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সম্পর্কে ফাটল
মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি-আমিরাতের নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ফাটল

মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে একই কৌশলগত অবস্থানে থাকা দুই আঞ্চলিক শক্তি—সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)—এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিচ্ছে। তেল উৎপাদন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রভাব—সব ক্ষেত্রেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে দুই দেশ। ওপেক থেকে শুরু করে ইয়েমেন ও সুদানের মতো সংঘাতপূর্ণ ইস্যুতেও এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। একসময় যে সম্পর্ককে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি হিসাবে দেখা হতো, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে নীরব প্রতিযোগিতার ময়দানে। ফলে একসঙ্গে চলার সেই পুরোনো সমীকরণ ভেঙে সৌদি-আমিরাত এখন দাঁড়িয়ে আছে সরাসরি আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াইয়ে।

ওপেক ত্যাগ: সম্পর্ক ভাঙনের স্পষ্ট ইঙ্গিত

গত সপ্তাহে ওপেকের সদস্যপদ ত্যাগের ঘোষণা দেয় ইউএই। এই সিদ্ধান্ত শুধু বৈশ্বিক তেল বাজারেই নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তকে সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভাঙনের সর্বশেষ ও সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসাবে দেখছেন। একসময় পারস্য উপসাগরের এই দুই শক্তিশালী দেশকে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হিসাবে বিবেচনা করা হতো। তবে এখন তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতা ও বিরোধের দিকে মোড় নিয়েছে।

মিত্রতা থেকে বিভাজনের শুরু

প্রায় এক দশক আগে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং ইউএইর নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদকে একই আদর্শের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসাবে বিবেচনা করা হতো। আরব বসন্ত-পরবর্তী সময়ের অস্থিরতা মোকাবিলায় তারা একসঙ্গে কাজ করেন। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো, কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ এবং ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ অবস্থান—সব ক্ষেত্রেই একসঙ্গে ছিল তারা। কিন্তু বর্তমানে সেই সম্পর্ক একেবারেই ভিন্ন রূপ নিয়েছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ, জ্বালানি নীতি এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিযোগিতায় এখন দুই দেশই একে অপরের বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দ্বন্দ্ব বেশ স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে দুবাই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান আর্থিক ও লজিস্টিক কেন্দ্র। কিন্তু গত কয়েক বছরে সৌদি আরব নিজেদেরকে ব্যবসা ও পর্যটনের কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে রিয়াদে আঞ্চলিক সদর দফতর স্থাপনের বাধ্যবাধকতা দেওয়ার পর শত শত কোম্পানি সেখানে অফিস স্থাপন করেছে। এতে ইউএই মনে করছে, সৌদি আরব সরাসরি তাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবেশ করছে। এছাড়া দুই দেশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈশ্বিক অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে, যেখানে তারা প্রায় একই ধরনের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের লক্ষ্য করছে। তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও মতবিরোধ রয়েছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে জোটে আধিপত্য ধরে রেখেছে। ইউএই-এর অভিযোগ, তাদের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

ইয়েমেন নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান

ইয়েমেনে দুই দেশের বিভাজন সবচেয়ে স্পষ্ট। ২০১৫ সালে তারা একসঙ্গে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করলেও পরে লক্ষ্য ভিন্ন হয়ে যায়। সৌদি আরব একটি ঐক্যবদ্ধ ইয়েমেন চায়, যাতে দক্ষিণ সীমান্ত নিরাপদ থাকে। অন্যদিকে আমিরাত দক্ষিণ ইয়েমেনে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে সমর্থন দিয়ে আসছে, বিশেষ করে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে। ২০২৫ সালের শেষদিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন ইউএই-সমর্থিত বাহিনী ইয়েমেনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদসমৃদ্ধ এলাকা দখল করে নেয়। এরপর ডিসেম্বরে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী একটি অস্ত্রবাহী জাহাজে হামলা চালায় বলে দাবি করা হয়।

সুদানেও দ্বন্দ্বের ছায়া

সুদানের গৃহযুদ্ধও দুই দেশের বিরোধকে আরও গভীর করেছে। ২০১৯ সালে ওমর আল-বশির ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সৌদি ও ইউএই উভয়ই সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। কিন্তু পরে তারা ভিন্ন ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন দিতে শুরু করে। সৌদি আরব সুদানের সেনাবাহিনীকে সমর্থন দেয়, কারণ তারা মনে করে এটি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ইউএই-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে সমর্থন দিচ্ছে, যদিও তারা তা অস্বীকার করে। এই দ্বন্দ্ব এতটাই তীব্র হয়েছে যে হোয়াইট হাউজেও দুই দেশের বিরোধ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। তবে ব্যাপক মতবিরোধ সত্ত্বেও সৌদি আরব ও ইউএই কেউই সম্পর্ক ছিন্ন করার ইঙ্গিত দেয়নি। উভয় দেশই একে অপরকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। সোমবার আরব আমিরাতে ইরান হামলা চালানোর পর শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদকে ফোন করে ওই হামলার নিন্দা জানান মোহাম্মদ বিন সালমান। তবে ওপেক থেকে ইউএই-এর বেরিয়ে যাওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই সম্পর্কের মৌলিক উত্তেজনা সহজে দূর হওয়ার নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি-আমিরাতের এই টানাপোড়েন ভবিষ্যতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।