ভেনেজুয়েলায় গত সপ্তাহে আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৭১৯-এ দাঁড়িয়েছে। ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা নিহত মানুষদের এই সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা বলেছেন, নিখোঁজ বা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া কয়েক হাজার মানুষকে উদ্ধারে তৎপরতা চলছে।
আহত ও গৃহহীনের সংখ্যা
ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের নেতা জর্জ রদ্রিগেজ গতকাল সোমবার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, পরপর ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে আহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৫ হাজার ৩৪-এ পৌঁছেছে। এ ছাড়া ১৫ হাজার ৮৬৬ জন মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
নতুন আফটারশক ও উদ্ধার চ্যালেঞ্জ
গতকাল উদ্ধার তৎপরতা চলার মধ্যে ভেনেজুয়েলায় আরেকটি আফটারশক অনুভূত হয়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) বলেছে, ১০ কিলোমিটার (৬ মাইল) গভীরতায় ৪ দশমিক ৬ মাত্রার এই পরাঘাতের উৎপত্তিস্থল ছিল ভেনেজুয়েলার ক্যারিবীয় উপকূলে অবস্থিত কারাবালেদা শহরের উত্তরে। রদ্রিগেজ বলেন, নতুন এই কম্পনের কারণে অতিরিক্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতির তাৎক্ষণিক খবর পাওয়া যায়নি।
নতুন ভূমিকম্পের পর রাজধানী কারাকাসের চাকাও পৌর এলাকার অনেক বাসিন্দার মতো ৫১ বছর বয়সী কনসেপসিয়ন হার্নান্দেজও বাইরে বেরিয়ে আসেন। বার্তা সংস্থা এপিকে তিনি বলেন, ‘আমরা আবারও রাস্তায় নেমে এসেছি। সত্যিকারের শান্তির মুহূর্ত কবে পাব, আমি জানি না।’
উদ্ধার তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা
আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলো সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছে। মূলত উত্তরাঞ্চলের বন্দরনগরী লা গুয়াইরাকে কেন্দ্র করে তারা উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এলাকাটি।
কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, এখনো কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ। তাঁদের খুঁজে বের করতে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৩০ হাজার জরুরি সেবাকর্মী এবং ২ হাজার ৭০০ বিদেশি বিশেষজ্ঞ উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।
জীবিত উদ্ধারের আশা
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা গত শনিবার সন্ধ্যায় পার হয়ে গেছে। তবে গত রোববার কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হওয়ায় আশার আলো দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার ও পানির ব্যবস্থা থাকলে আটকে পড়া মানুষের বেঁচে থাকার সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে।
রোববার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজ বলেন, ‘আজ আমরা কিছু মানুষকে জীবিত উদ্ধার করেছি। তাই অভিযান বন্ধ করা হচ্ছে না। আমরা সব সময়ই আশা ধরে রাখি।’
আন্তর্জাতিক সহায়তা ও উদ্ধার সাফল্য
ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা ২৪টি দেশের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছে। এসব দেশ ৫০০ টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী, ২ হাজার ৭০০ জন উদ্ধার ও সহায়তাকর্মী, অনুসন্ধানী কুকুরসহ প্রায় ৮৬টি বিশেষ উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে।
এদিকে সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি উদ্ধার অভিযানের ঘটনা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, লা গুয়াইরার একটি ধসে পড়া ভবন থেকে অ্যারন লেভি নামের ২১ বছর বয়সী এক তরুণকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বুকেলে লিখেছেন, ‘এই উদ্ধার অভিযান ভেনেজুয়েলা, মেক্সিকো ও এল সালভাদরের উদ্ধারকারী দলগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে সম্ভব হয়েছে।’
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট বলেন, অ্যারন লেভি ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা ১০৬ ঘণ্টা আটকে থাকার পর উদ্ধার হন।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অবস্থা
কাটিয়া লা মার এলাকা থেকে গত রোববার আল-জাজিরার সাংবাদিক তেরেসা বো লা গুয়াইরা বলেন, অনেক পরিবারের সদস্য তাঁদের স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করতে না পেরে ধসে পড়া বাড়িগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করে রেখেছেন। স্বজনদের মরদেহ উদ্ধারের অপেক্ষায় পরিবারের সদস্যরা ধ্বংসস্তূপের বাইরে অপেক্ষা করছেন।
পানি, খাদ্যসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় পৌঁছাতে শুরু করেছে। এসব অঞ্চলের অনেক বাসিন্দা এখনো ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন।
তেরেসা বো বলেন, এই দুর্যোগ একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় পরীক্ষা, তেমনি এটি প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজের নতুন সরকারের জন্যও একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে মার্কিন সামরিক বাহিনী অপহরণ করার পর রদ্রিগেজ দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।



