মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় স্থাপনা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) তার কার্যকালের প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছে। ৪২০ টন ওজনের এই বিশাল ভাসমান গবেষণাগারটিকে কক্ষপথ থেকে নামিয়ে এনে প্রশান্ত মহাসাগরের ‘পয়েন্ট নিমো’ নামক প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার প্রস্তুতি নিচ্ছে নাসা।
নিয়ন্ত্রিত পতনের পরিকল্পনা
নাসার ভাষ্যে, মহাকাশ স্টেশনকে পৃথিবীর বুকে ফিরিয়ে আনার জন্য এটিই সবচেয়ে নিরাপদ এবং দায়িত্বশীল উপায়। নাসার ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন ট্রানজিশন পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, মহাকাশ স্টেশনকে কক্ষপথ থেকে নামানোর প্রধান উদ্দেশ্য হলো এর বিশাল কাঠামোটিকে সমুদ্রের একটি জনমানবহীন অঞ্চলে পুনঃপ্রবেশ করানো। নিয়ন্ত্রিত এই পতনের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে এর ধ্বংসাবশেষ কোনোভাবেই মানুষের বসতি অঞ্চল বা স্থলভাগে আছড়ে না পড়ে এবং মানবজীবনের কোনো ক্ষতি না হয়।
বায়ুমণ্ডলে তীব্র গতির কারণে পুনঃপ্রবেশের সময় মহাকাশ স্টেশনের বেশির ভাগ অংশই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন এর কিছু কিছু অংশ অত্যন্ত তাপপ্রতিরোধী ধাতু দিয়ে তৈরি হওয়ায় সেগুলো অক্ষত অবস্থায় সমুদ্রের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়বে।
পরিবেশগত উদ্বেগ
তবে পরিবেশবিদ ও সামুদ্রিক বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ এই পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করছেন। তাঁদের মতে, বিপুল পরিমাণ মহাকাশ বর্জ্য সাগরে ফেলার এই সিদ্ধান্ত সমুদ্রের স্বাস্থ্য, পরিবেশদূষণ এবং গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রশান্ত মহাসাগরের পয়েন্ট নিমো অঞ্চলটি মানুষের বসতি থেকে অনেক দূরে হওয়ায় এটিকে মহাকাশযানের কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এখানে ধাতব বর্জ্য ফেলার ফলে গভীর সমুদ্রের পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে খুব কম গবেষণাই হয়েছে। স্টেশনের ভারী ধাতব অংশ, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং বিষাক্ত রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ কীভাবে গভীর সমুদ্রের অণুজীব ও জলজ প্রাণীদের ক্ষতি করবে, তা এখনো অজানা।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
বিশ্বজুড়ে যেভাবে স্যাটেলাইট ও রকেট উৎক্ষেপণের হার বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে আরও বহু মহাকাশযান এভাবে সাগরে ফেলা হবে। ফলে মহাসাগরের ওপর এর সামগ্রিক প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে। নাসা নিশ্চিত করেছে, মিশন শেষে আইএসএস-কে কক্ষপথে ফেলে রাখা বা আরও উঁচুতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে না। কারণ, দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে মহাকাশ স্টেশনটির ভেতরের বিভিন্ন কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং এটি রক্ষণাবেক্ষণের খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য এটি চালানো অসম্ভব।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া



