ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন নিয়ে বিভ্রান্তি: ট্রাম্পের দাবি বনাম বাস্তবতা
ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন নিয়ে বিভ্রান্তি

ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন নিয়ে মার্কিন প্রশাসনে বিভ্রান্তি

গত কয়েক দিনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার সহযোগীদের বার্তাগুলো বিশ্ববাসীকে ব্যাপকভাবে বিভ্রান্ত করেছে। পারস্য উপসাগরে যুদ্ধবিমান চলাচলের মতোই এই সপ্তাহে 'শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন' শব্দবন্ধটি মার্কিন প্রশাসনের অন্দরে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। তবে এই শব্দের প্রকৃত অর্থ কী, কিংবা চার সপ্তাহের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আদৌ তা অর্জন করতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে খোদ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যেই মতভেদ দেখা দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এই খবর জানিয়েছে।

ট্রাম্পের দাবি বনাম কর্মকর্তাদের সন্দেহ

গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইরানের বর্তমান সরকার সম্পর্কে একটি দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, 'যেহেতু শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, তাই এই নতুন সরকারের আগের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হওয়া উচিত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ইচ্ছুক।' সাধারণত 'শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন' বলতে বোঝায় কোনো দেশের নেতৃত্ব বা সরকারকে জোরপূর্বক হটিয়ে নীতি, রাজনীতি ও প্রশাসনে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা। কিন্তু ইরানে এখনও একটি ধর্মতান্ত্রিক নেতৃত্ব ক্ষমতায় রয়েছে, যারা কেবল কর্তৃত্ববাদী বা আমেরিকাবিরোধীই নয়, বরং তারা এখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

গত সোমবার এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও ইরানের শাসনব্যবস্থায় আদৌ কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'এই মোল্লাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং এর নেতারাই মূল সমস্যা। যদি এখন নতুন এবং কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন কোনো নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসে, তবে তা সবার জন্য সুখবর। কিন্তু আমাদের সেই সম্ভাবনা বা বাস্তবতার জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে যে, আদতে তেমন কিছু ঘটেনি।' পরে আল-জাজিরাকে রুবিও স্পষ্ট করে বলেন, ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। তিনি স্বীকার করেন যে, বর্তমান নেতৃত্ব বা হেগসেথের ভাষায় 'নতুন শাসনব্যবস্থা' আসলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীই থেকে গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রাম্পের যুদ্ধের সূচনা ও দাবি

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ হামলা চালিয়ে যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন। হামলার পর তিনি ইরানিদের নিজ দেশের সরকারকে উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইসরায়েলি নেতারা ট্রাম্পকে এমন গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা ঘটেনি। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প এখন 'শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন' সফল হয়েছে বলে দাবি করছেন।

রবিবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে একটি নয়, বরং দুটি ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, 'শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ইতোমধ্যে ঘটেছে। একটি শাসনব্যবস্থা তো ধ্বংসই হয়ে গেছে, তারা সবাই মৃত। দ্বিতীয় শাসনব্যবস্থাও প্রায় শেষ। এখন আমরা তৃতীয় এক দলের সঙ্গে আলোচনা করছি যাদের সঙ্গে আগে কেউ কখনও কথা বলেনি। তাই আমি একে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনই মনে করি।' ট্রাম্পের এই মন্তব্যে মূলত আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগের বিষয়টি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যদিও মোজতবা খামেনি নিজেও হামলায় আহত হয়েছেন এবং যুদ্ধের শুরু থেকে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতামত

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই 'শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন' আসলে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং নেতৃত্বের শীর্ষ ব্যক্তিদের সরিয়ে দিয়ে নিজের অনুগত কাউকে ক্ষমতায় বসানো, যাকে বলা হচ্ছে 'এম্পায়ার রিসারেকশন' বা সাম্রাজ্য পুনরুত্থানের একটি অংশ। এক্ষেত্রে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার মডেল অনুসরণ করছেন, যেখানে নিকোলাস মাদুরোকে সরিয়ে ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছিল।

ওয়াশিংটনের কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক করিম সাজাদপুর বলেন, 'ইরানে কেবল ব্যক্তিদের পরিবর্তন হয়েছে, শাসনব্যবস্থার নয়। একই মতাদর্শের ভিন্ন ভিন্ন মানুষ এখন ক্ষমতায়।' হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সোমবার বলেন, আগের নেতাদের সঙ্গে কূটনীতি অসম্ভব হয়ে পড়েছিল বলেই তাদের 'পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া' হয়েছে। তিনি বলেন, 'তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিথ্যাচার করেছেন এবং আলোচনাকে দীর্ঘায়িত করেছেন, যা প্রেসিডেন্টের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।'

২০১৬ সালের নির্বাচনি প্রচারণায় ট্রাম্প ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সমালোচনা করেছিলেন এবং রাষ্ট্র গঠনের নীতি ত্যাগের কথা বলেছিলেন। এখন ইরানে তার এই 'নেতৃত্ব ধ্বংস' করাকেই 'শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা চলছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ওয়াশিংটনের ডিফেন্স প্রায়োরিটিসের মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের পরিচালক রোজমেরি কেলানিক বলেন, 'পুরো প্রশাসন এখন যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে গভীর শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পথ থেকে সরে আসছে বলে মনে হচ্ছে। ইরানে প্রকৃত শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলে বিপুল সংখ্যক স্থল সেনা পাঠাতে হবে, যা ট্রাম্প বুদ্ধিমানের মতো করতে চাচ্ছেন না। কারণ এর ঝুঁকি ও খরচ অর্জিত সুবিধার চেয়ে অনেক বেশি।'