লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ইউনিফিলের তিন ইন্দোনেশীয় শান্তিরক্ষী নিহত
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর পৃথক দুটি হামলায় জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিরক্ষা বাহিনী ইউনিফিলের তিন ইন্দোনেশীয় সদস্য নিহত হয়েছেন। গত ২ মার্চ ইসরায়েল এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শান্তিরক্ষী বাহিনীর ওপর এটিই প্রথম প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
দুটি পৃথক হামলার বিস্তারিত বিবরণ
সোমবার (৩০ মার্চ) দক্ষিণ লেবাননের বানি হাইয়ানের কাছে শান্তিরক্ষীদের একটি গাড়ি লক্ষ্য করে অজ্ঞাত বিস্ফোরণ ঘটানো হলে দুই সেনাসদস্য প্রাণ হারান এবং আরও দুজন গুরুতর আহত হন। এর আগে গত রোববার দিবাগত রাতে আদচিত আল-কুসাইর গ্রামের কাছে শান্তিরক্ষীদের একটি অবস্থানের পাশে সরাসরি কামানের গোলার আঘাতে আরও একজন ইন্দোনেশীয় শান্তিরক্ষী নিহত হন। ইউনিফিলের মুখপাত্র ক্যান্ডিস আরডিয়েল জানিয়েছেন যে, এই দুটি আলাদা ঘটনার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও প্রতিক্রিয়া
শান্তিরক্ষীদের ওপর এই রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার এক বিবৃতিতে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে যে, শান্তিরক্ষীদের ওপর যেকোনো ধরণের আঘাত সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং এটি আন্তর্জাতিক রীতির পরিপন্থী। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুগিওনো মঙ্গলবার জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে কথা বলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (টুইটার) এই ‘জঘন্য হামলার’ দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি এই পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
জাকার্তার পক্ষ থেকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনের নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করে অবিলম্বে শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তোলা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই হামলার কড়া সমালোচনা করে বলেছেন যে, শান্তিরক্ষীদের লক্ষ্যবস্তু করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের একটি গুরুতর লঙ্ঘন এবং এটি সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা প্রধান জঁ-পিয়েরে ল্যাক্রোইক্স সাংবাদিকদের স্পষ্ট জানিয়েছেন, শান্তিরক্ষীরা কখনোই কোনো যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হওয়া উচিত নয় এবং এই ধরনের অগ্রহণযোগ্য ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া ও চলমান সংঘাত
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী মঙ্গলবার ভোরে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা এই দুটি ঘটনার খবর সম্পর্কে অবগত এবং এই হতাহতের ঘটনাটি হিজবুল্লাহর আক্রমণ নাকি ইসরায়েলি বাহিনীর কার্যক্রমের ফলে ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত চরম আকার ধারণ করায় সেখানে অবস্থানরত কয়েক হাজার আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষীর জীবন এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। লিটানি নদীর দক্ষিণ অংশে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের স্থল অভিযান ও বিমান হামলা জোরদার করায় সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ ও শান্তিরক্ষীদের জন্য নিরাপদ সরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শান্তিরক্ষীদের ওপর এই ধরনের হামলা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এবং ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ আরও বৃদ্ধি করতে পারে। আপাতত ইউনিফিল তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখলেও সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে চলমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।



