পেন্টাগনের অন্দরে ধর্মীয় বিশ্বাসের ছায়া: মার্কিন সামরিক বাহিনীতে উদ্বেগজনক প্রবণতা
২০২৬ সালের ২ মার্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভিতরে দানা বেঁধে ওঠা সংকটকে উন্মোচিত করে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি শক্তিশালী কমব্যাট ইউনিটের কমান্ডার তার অধস্তন কর্মকর্তাদের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সমবেত হন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ইরানের সাথে চলমান এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কোনো সাধারণ ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত নয়; বরং এটি ‘ঈশ্বরের পরিকল্পনার’ এক অমোঘ অংশ। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ‘আরমাগেডন’ বা বাইবেল বর্ণিত মহাপ্রলয় শুরুর জন্য ‘অভিষিক্ত’ হয়েছেন।
ধর্মীয় উদ্ধৃতি ও বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যবহার
রূপকথার গল্পের মতো শোনালেও, এটি বর্তমানে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ বা পেন্টাগনের অন্দরে দানা বেঁধে ওঠা এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের কাছে জমা পড়া শতাধিক অভিযোগ কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। লুইজিয়ানা থেকে শুরু করে বিদেশের মাটিতে মোতায়েন থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো থেকেও একই ধরনের খবর আসছে। অভিযোগ উঠেছে, মার্কিন কমান্ডাররা যুদ্ধের ময়দানে বাইবেলের ‘বুক অফ রেভেলেশন’-এর উদ্ধৃতি দিচ্ছেন এবং এই সংঘাতকে যিশু খ্রিস্টের পুনরুত্থানের পূর্বলক্ষণ হিসেবে প্রচার করছেন।
বিষয়টি এতটাই গুরুত্ব পেয়েছে যে, জ্যারেড হাফম্যান এবং জেমি রাসকিনের মতো প্রভাবশালী কংগ্রেস সদস্যরা এখন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলকে দিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত গত ৪ দিনে এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর একাধিক ধর্মীয় বিশ্লেষক বাইবেলের বিভিন্ন ভবিষ্যদ্বাণীর দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
বাইবেলের অনুচ্ছেদ ও ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা
ম্যাথু ২৪:৬-৭ অনুচ্ছেদে যিশুর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যুদ্ধ ও যুদ্ধের গুজব শুনবে, কিন্তু ভয় পেয়ো না। জাতির বিরুদ্ধে জাতি এবং রাজ্যের বিরুদ্ধে রাজ্য উঠবে।’ একইভাবে ইজেকিয়েল ৩৮:৫ অনুচ্ছেদে ‘পারস্য’ বা বর্তমান ইরানের কথা উল্লেখ আছে, যেখানে ‘শেষ জমানায়’ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী জোট গঠনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ইউটিউবের জনপ্রিয় ‘লিভিং ওয়াটার্স’ পডকাস্টের গবেষকরা গত বছরই সতর্ক করেছিলেন, প্রেরিত পলের থেসালোনিকীয় ৫:৩-এর ‘শান্তি ও নিরাপত্তা’র বার্তার পর হঠাৎ বিনাশ আসবে।
কাকতালীয়ভাবে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর ট্রাম্প যখন ‘এখনই শান্তির সময়’ বলে পোস্ট দেন, ঠিক তখনই দামেস্কের একটি গির্জায় ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ২২ জন নিহত হন। এই দুটি ঘটনার সময়কাল ও ধরন ধর্মতাত্ত্বিকদের মধ্যে ‘শেষ দিনের’ আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।
সামরিক পেশাদারিত্ব ও সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার সংকট
মার্কিন সামরিক বাহিনীর মূল ভিত্তি হলো এর সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা। যেকোনো যুদ্ধের ময়দানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই অলিখিত দেয়ালটি ধসে পড়ছে। যখন একজন কমান্ডার যুদ্ধকে ‘পূর্বনির্ধারিত’ বা ‘অবশ্যম্ভাবী’ বলে প্রচার করেন, তখন সেটি আর ব্যক্তিগত বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বকে গ্রাস করে ফেলে।
ইরানের ‘ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) একটি ধর্মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করলেও যুক্তরাষ্ট্র যদি সেই একই পথে হাঁটে, তবে তা প্রাতিষ্ঠানিক পতন হিসেবে গণ্য হবে। সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি সব সময় অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা পরিবর্তন করে। কিন্তু যখন কোনো সংঘাতকে ‘দৈব চিত্রনাট্য’ হিসেবে দেখা হয়, তখন বিকল্প কোনো চিন্তার সুযোগ থাকে না।
ধর্মীয় আবেশের প্রভাব ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
যদি ধরে নেওয়া হয় যে যুদ্ধের ফলাফল ঈশ্বর আগে থেকেই লিখে রেখেছেন, তবে সেখানে বুদ্ধিদীপ্ত বিশ্লেষণ বা কূটনৈতিক আলোচনার কোনো স্থান থাকে না। এর ফলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় ‘রেড-টিমিং’ বা বিকল্প পরিকল্পনার ক্ষেত্রে। কোনো কর্মকর্তা যদি শান্তি বা ডিল-এর প্রস্তাব দেওয়াকে ‘ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরোধিতা’ হিসেবে দেখেন, তবে তিনি সত্য বলা থেকে বিরত থাকবেন, যা সামরিক বাহিনীর জন্য আত্মঘাতী।
পেন্টাগনের বর্তমান নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও এই ধর্মীয় আবেশের ছায়া দেখা যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বিভিন্ন দাপ্তরিক সভায় প্রকাশ্যেই ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করছেন। ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে বসে তার এই ধরনের মন্তব্য নিচুতলার কমান্ডারদের জন্য একটি পরোক্ষ বার্তা হিসেবে কাজ করে। সামরিক বাহিনীর মতো একটি কঠোর সোপানযুক্ত প্রতিষ্ঠানে লিখিত আদেশের চেয়েও উপরের মহলের ‘মনোভঙ্গি’ অনেক সময় বেশি কার্যকরী হয়।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্ব নিরাপত্তার হুমকি
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ডিটারেন্স কাজ করে যুক্তির ওপর ভিত্তি করে। ইরান যদি মনে করে, ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তগুলো কোনো যৌক্তিক বিশ্লেষণ নয় বরং ‘দৈববাণী’ দ্বারা পরিচালিত, তবে তারা কোনো কূটনৈতিক সংলাপে অংশ নেওয়ার আগ্রহ হারাবে। মিত্র দেশগুলোও আজ সন্দিহান। একটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র যদি বৈজ্ঞানিক তথ্যের চেয়ে ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে, তবে তা পুরো বিশ্বের নিরাপত্তার জন্যই হুমকি।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভিতরে ধর্মীয় প্রভাবের এই প্রবণতা কেবল অভ্যন্তরীণ সংকটই নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সূত্র: ডেইলি মেইল



