ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কি লন্ডন-প্যারিসে আঘাত হানতে পারে? মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর উদ্বেগ
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লন্ডন-প্যারিসে আঘাত হানতে পারে? মার্কিন উদ্বেগ

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র উদ্বেগ

হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও উপস্থিত ছিলেন। হেগসেথ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইরানের হাতে থাকা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ভবিষ্যতে লন্ডন পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হতে পারে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি নতুন ধরনের ঝুঁকির সম্ভাবনা তৈরি করছে।

দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা

২৬ মার্চের ওই বৈঠকে ২০ মার্চের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা আলোচনা করা হয়। সেদিন ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে অবস্থিত ব্রিটিশ-আমেরিকান যৌথ সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। এই দ্বীপটি আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মাঝামাঝি অবস্থিত এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

ক্ষেপণাস্ত্র দুটির মধ্যে একটি মাঝপথেই ভেঙে পড়ে এবং অন্যটি আকাশেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়। ফলে কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটেনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাজ্য সরকার নিশ্চিত করেছে যে এই হামলায় কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন মূল্যায়ন

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। পূর্বে ধারণা করা হতো যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই ঘটনার পর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে ইরান এর চেয়েও অনেক বেশি দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম হতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অস্ট্রেলিয়ার একটি সংবাদমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ইরান এই হামলার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছে—তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। দিয়েগো গার্সিয়ার দূরত্ব ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার হওয়ায় এই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মূল্যায়ন

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) মনে করছে, এই প্রথম কোনো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এত দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করেছে। এর আগে এমন সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুত্তে বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। অপরদিকে, ইরান সরকার এই অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে জানিয়েছে যে তারা কোনো সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়নি।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, ইরান ক্রমাগত তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং তা ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার জন্য বড় ধরনের হুমকি হতে পারে। তবে ব্রিটিশ সরকার এই দাবি পুরোপুরি মেনে নেয়নি এবং জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য বর্তমানে সরাসরি কোনো ঝুঁকিতে নেই।

ইউরোপীয় শহরগুলোর দূরত্ব বিশ্লেষণ

দূরত্বের হিসেবে দেখা যায়, তেহরান থেকে বার্লিনের দূরত্ব প্রায় ৩৫০০ কিলোমিটার, প্যারিসের দূরত্ব প্রায় ৪২০০ কিলোমিটার এবং লন্ডনের দূরত্ব প্রায় ৪৪০০ কিলোমিটার। এই হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য ঝুঁকি

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে এত দূর পর্যন্ত নির্ভুলভাবে আঘাত হানা খুবই কঠিন। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের একজন বিশ্লেষক জানান, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়ানো সম্ভব হলেও এতে এর নির্ভুলতা কমে যায়।

অন্য গবেষকরাও একমত পোষণ করে বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লন্ডন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে—এমন সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে বাস্তবে সেই ঝুঁকি খুব কম। এর একটি বড় কারণ হলো, যুক্তরাজ্য ন্যাটোর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে, যা সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে ইরানের কাছে বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যার মধ্যে কিছু স্বল্পপাল্লার এবং কিছু মধ্যম পাল্লার। তবে দীর্ঘপাল্লার সক্ষমতা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান হয়ত তাদের মহাকাশ কর্মসূচি বা ভবিষ্যৎ সামরিক প্রয়োজনের জন্য এই ধরনের দীর্ঘপাল্লার প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে।

সব মিলিয়ে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ থাকলেও, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের জন্য তাৎক্ষণিক বড় ধরনের হুমকির সম্ভাবনা এখনো কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভবিষ্যতে ন্যাটো এবং পশ্চিমা দেশগুলোর পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে এই পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়।