হুতি বিদ্রোহীদের জাহাজ জব্দ: লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধের আশঙ্কা
ইয়েমেনের আল-সালিফ উপকূলে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ জব্দ করেছে হুতি বিদ্রোহীরা। ৫ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে এই ঘটনা ঘটে। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইয়েমেনের হুতিরা ইরান যুদ্ধে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছে। তবে, তেহরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করছে তারা ঠিক কী পদক্ষেপ নেবে, তার ওপর।
হুতিদের সম্ভাব্য কৌশল
হুতিরা দূর থেকে ইসরায়েলের দিকে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়ে খুবই সরু বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কার্যত লোহিত সাগর দিয়ে নৌ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব, যেভাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি অচল করে দিয়েছে।
যদি তা-ই হয়, ইরান ও হুতিরা যেসব দেশকে পছন্দ করে না, যদি দুটি নৌপথেই সেসব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার সম্মিলিত প্রভাব হবে মারাত্মক বিপর্যয়কর। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে।
হুতিদের পটভূমি ও শক্তি
২০১৪ সাল থেকে রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে। তারা মূলত শিয়া মুসলমান এবং ইসরায়েলের প্রতি তাদের রয়েছে গভীর ঘৃণা। হুতিরা নিজেদের আন্দোলনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলায় সক্ষম বলে পরিচিত।
২০২৫ সালের আগস্টে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইসরায়েল একবার হামলা চালিয়েই ইয়েমেনের হুতি প্রধানমন্ত্রী, তাদের সামরিক প্রধান এবং মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যকে হত্যা করেছিল। কিন্তু ইসরায়েল কখনোই হুতি আন্দোলনের নেতা আবদুল মালিক আল-হুতির অবস্থান সনাক্ত করতে পারেনি।
হুতিদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
যদিও এখন পর্যন্ত হুতিরা সরাসরি ইরানের পক্ষে লড়াই করেনি; তবে তেহরান থেকে মদদ পায় তারা। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের অনেক অস্ত্রের জোগানদাতা তেহরান। ২০২৩ সালের অক্টোবরে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচল করা যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজে হুতিরা হামলা চালিয়েছিল। তার পাল্টায় ইয়েমেনে হুতি অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হুতিদের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, যা ২০২৫ সালের মে মাস থেকে কার্যকর রয়েছে।
সে সময় হুতিরা জোর দিয়ে বলেছিল, ওই যুদ্ধবিরতি কোনোভাবেই ইসরায়েলের ওপর প্রযোজ্য নয়। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও তারা ইসরায়েলে কিছু কিছু হামলা চালিয়ে গেছে। হুতিদের ওই যুদ্ধবিরতির একটি কারণ ছিল ইরানের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল, যাতে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা শুরু হওয়ার আগে তেহরান নিজের শক্ত অবস্থান বজায় রাখতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
লন্ডনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক চাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফারেয়া আল-মুসলিমি সতর্ক করে বলেন, বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে যদি দীর্ঘমেয়াদে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তবে জাহাজে পরিবহন খরচ বাড়াবে, যা তেলের দাম বাড়িয়ে দেবে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তা এরই মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
আঞ্চলিক রাজনীতি
হুতিরা সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে পারে, কারণ তারা সৌদি আরব থেকে নগদ পুরস্কারের আশায় রয়েছে। ইয়েমেনের দক্ষিণে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) নামে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সৌদি আরব আপাতত সে আন্দোলনকে দমন করেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী এসটিসিকে সমর্থন দিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত, কিন্তু সৌদি আরবের চাপে পড়ে এ বছরের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন ছেড়ে চলে গেছে।
এর অর্থ, এখন ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দায় একমাত্র সৌদি আরবের ওপর। তবে এ জন্য এখন রিয়াদকে শুধু এসটিসির সাবেক সমর্থকদের সঙ্গেই নয়, বরং হুতিদের সঙ্গেও একটি কার্যকর চুক্তিতে উপনীত হতে হবে, যা বেশ জটিল কাজ। ইয়েমেনে এসটিসি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত, কিন্তু বাস্তবে এর অস্তিত্ব রয়ে গেছে এবং তারা ইয়েমেনে জাতিসংঘ-সমর্থিত সরকার এবং সৌদি আরবকে ব্যর্থ হতে দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
হুতিরা যদি ইরান যুদ্ধে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের মূল সামর্থ্য ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার নয়, বরং লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার মধ্যে নিহিত। তবে এতে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইয়েমেন শান্তি থেকে আরও দূরে সরে যাবে। ইয়েমেনের জন্য জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বলেছেন, এই উত্তেজনা ইয়েমেনকে আঞ্চলিক যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে দিতে পারে, যা ইয়েমেনে সংঘাত সমাধানকে আরও কঠিন করবে, অর্থনৈতিক প্রভাবগুলোকে গভীরতর করবে এবং সাধারণ মানুষদের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত করবে।



