ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে হুথিদের সরাসরি অংশগ্রহণ: বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দীর্ঘপ্রতীক্ষিত সরাসরি অংশগ্রহণ আঞ্চলিক সংঘাতকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান-সমর্থিত এই শিয়া মতাদর্শী গোষ্ঠীর কৌশলগত সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ করার হুমকি
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে হুথিরা কেবল ইসরাইল অভিমুখে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালিয়েই ক্ষান্ত হবে না, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। যদি ইরান হরমুজ প্রণালি এবং হুথিরা লোহিত সাগরের প্রবেশপথ একসাথে অবরুদ্ধ করে, তবে বিশ্ববাণিজ্যে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে।
২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই গোষ্ঠীটি ইসরাইলবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত হলেও এতকাল তারা ইরানের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি। গত বছরের আগস্টে ইসরাইলি গোয়েন্দা হামলায় তাদের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হওয়ার পরও তারা সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও আঞ্চলিক সমীকরণ
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফারিয়া আল-মুসলিম সতর্ক করেছেন যে লোহিত সাগরে হুথিদের অব্যাহত আক্রমণের ফলে জাহাজ চলাচলের খরচ এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এটি এমনিতেই ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলবে।
বর্তমানে বড় জাহাজ কোম্পানিগুলো লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি করছে। হুথিদের এই পদক্ষেপকে আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করার ইরানি কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে হুথিদের যুদ্ধযাত্রার পেছনে কিছু অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সমীকরণও কাজ করছে:
- একদিকে তারা সৌদি আরবের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধার প্রত্যাশা করছে
- অন্যদিকে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত রাখতে চায়
- সৌদি আরব বর্তমানে ইয়েমেনের দক্ষিণ অংশের নিয়ন্ত্রণ ও শান্তি বজায় রাখতে হুথিদের সঙ্গে পর্দার আড়ালে সমঝোতা করতে আগ্রহী হতে পারে
জাতিসংঘের গভীর উদ্বেগ
জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই উত্তেজনা ইয়েমেনকে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের অতল গহ্বরে টেনে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। এর ফলে এক দশকের বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া কেবল দীর্ঘায়িতই হবে না, বরং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক সংকট চরম সীমায় পৌঁছাবে।
ওমানের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের মে মাস থেকে মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ রাখার একটি যুদ্ধবিরতি চললেও ইসরাইলের ক্ষেত্রে হুথিরা কখনোই সেই নমনীয়তা দেখায়নি। এখন ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার প্রেক্ষাপটে তারা সরাসরি ইসরাইলি সামরিক স্থাপনায় হামলা শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত হুথিদের প্রকৃত শক্তি ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ায় নয়, বরং সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ করার ক্ষমতার মধ্যেই নিহিত। এই কৌশলগত ক্ষমতা ব্যবহার করলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে যে ধ্বস নামবে, তার প্রভাব সমগ্র বিশ্ব অনুভব করবে।



