ইরানে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন, ট্রাম্পের অনুমোদন অনিশ্চিত
ইরানে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন

ইরানে মার্কিন স্থল অভিযানের পরিকল্পনা, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত অনিশ্চিত

মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগন ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী একটি বড় ধরনের স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন সেনা ও মেরিন সদস্যের আগমনের মধ্যেই এই সংবেদনশীল খবর সামনে এসেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে এটি সংঘাতের এক বিপজ্জনক নতুন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে।

পেন্টাগনের গোপন পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য লক্ষ্য

পেন্টাগনের এই পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সম্ভাব্য এই স্থল অভিযান কোনও সর্বাত্মক আক্রমণ বা দখলদারিত্ব হবে না। বরং এতে স্পেশাল অপারেশন ফোর্স এবং প্রচলিত পদাতিক বাহিনীর সমন্বয়ে অতর্কিত অভিযান চালানো হতে পারে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটনে কাজ চলছে।

প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইরানের তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী উপকূলীয় এলাকাগুলোতে অভিযান চালিয়ে ইরানের সেসব অস্ত্র ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা দিয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে হামলা চালানো সম্ভব। একজন কর্মকর্তা জানান, এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে ‘কয়েক মাস নয়, বরং কয়েক সপ্তাহ’ সময় লাগতে পারে। তবে অন্য একজন কর্মকর্তার মতে, সময়সীমা কয়েক মাস পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিমুখী অবস্থান ও হুমকি

শনিবার পর্যন্ত এটি স্পষ্ট ছিল না যে, ট্রাম্প পেন্টাগনের এই পরিকল্পনার কতটুকু অনুমোদন করবেন। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ বন্ধের সংকেত এবং একই সঙ্গে হামলার হুমকি; এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট মঙ্গলবার সতর্ক করে বলেন, তেহরান যদি পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ না করে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ না করে, তবে ট্রাম্প তাদের ওপর নরক নামিয়ে আনতে প্রস্তুত।

লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘কমান্ডার ইন চিফকে সর্বোচ্চ বিকল্প পথ বাতলে দেওয়া পেন্টাগনের কাজ। এর মানে এই নয় যে প্রেসিডেন্ট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন।’ অন্যদিকে গত ২০ মার্চ ওভাল অফিসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি কোথাও সেনা পাঠাচ্ছি না। যদি পাঠাতামও, তবে আপনাদের বলতাম না। তবে আমি কোনও সেনা পাঠাচ্ছি না।’

মিত্র দেশগুলোর উদ্বেগ ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফ্রান্সে মিত্র দেশগুলোর উদ্বেগের জবাবে বলেছেন, ‘এটি কোনও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হতে যাচ্ছে না।’ তিনি আরও দাবি করেন, স্থল সেনা ছাড়াই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তবে অ্যাক্সিওস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগন ইরানে ‘চূড়ান্ত আঘাত’ হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মধ্যে বড় ধরনের বোমা হামলার পাশাপাশি আরও ১০ হাজার সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।

মার্কিন কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের মধ্যেও এ নিয়ে বিভক্তি রয়েছে। সাবেক নেভি সিল সদস্য ডেরেক ভ্যান অর্ডেন এবং ন্যান্সি মেস স্থল অভিযানের বিরোধিতা করলেও সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম খার্গ দ্বীপ দখলের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘ইও জিমা’ অভিযানের উদাহরণ টেনে গ্রাহাম বলেন, ‘আমরা ইও জিমা করতে পারলে এটিও পারব। আমি সবসময় মেরিনদের ওপর বাজি ধরি।’

সাম্প্রতিক হতাহত ও জনমত জরিপ

গত এক মাসে মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ইরাকে বিমান দুর্ঘটনায় ৬ জন, কুয়েতে ড্রোন হামলায় ৬ জন এবং সৌদি আরবে ১ জন নিহত হন। এ ছাড়া সাতটি দেশে ইরানি ড্রোন ও মিসাইল হামলায় তিন শতাধিক মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন।

জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইরানে মার্কিন স্থল সেনা মোতায়েনের বিষয়ে খোদ আমেরিকানদের মধ্যেই তীব্র বিরোধিতা রয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং এনওআরসি-র যৌথ জরিপ বলছে, ৬২ শতাংশ মার্কিনি স্থল অভিযানের বিপক্ষে, যেখানে মাত্র ১২ শতাংশ সমর্থন জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের সতর্কতা ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) তাদের তেল অবকাঠামোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মরণপণ লড়াই করতে পারে। ফলে অঞ্চলটি দখলের চেয়ে সেখানে মার্কিন সেনাদের সুরক্ষা দেওয়াই হবে পেন্টাগনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ মাইকেল আইজেনস্টাড সতর্ক করে বলেছেন, খার্গ দ্বীপের মতো ছোট জায়গায় সেনা পাঠানো বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ ইরান সেখানে ড্রোন ও কামানের গোলা বর্ষণ করতে পারে। তার মতে, সরাসরি দখলের চেয়ে দ্বীপটির চারপাশে মাইন পেতে চাপ সৃষ্টি করা এবং দ্রুত অভিযান চালিয়ে সরে আসা বেশি কার্যকর হতে পারে।