ইরানের হামলায় ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও উদ্বেগ
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বন্দরনগরী হাইফায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ১৬ জুনের ঘটনায় দক্ষিণ ইসরায়েলের অনেক বাসিন্দা সাইরেন শুনে বেজমেন্টে আশ্রয় নিলেও, ৫৪ বছর বয়সী ডেভিড আজরান বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশজুড়ে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের আলোর রেখা দেখেন। কাঁধে অ্যাসল্ট রাইফেল ঝুলিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণ কোনো লোক নই।’ তবে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর তাঁর অগাধ আস্থা এখন টলে গেছে।
হামলার বিস্তারিত ও প্রভাব
তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ওপর হামলার প্রথম দুই দিনেই পেন্টাগন ৫৬০ কোটি ডলার মূল্যের গোলাবারুদ খরচ করেছে। গত শনিবার রাতে প্রায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আরাদ ও ডিমোনার দুটি আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে। এতে আজরান ও তাঁর প্রতিবেশীদের অনেকের ঘরের জানালা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই হামলায় ১১৫ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত ব্যাখ্যা দেয়নি, ঠিক কী কারণে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটি ব্যর্থ হলো।
ডিমোনায় একদল কিশোর ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ির সামনে ড্রাম বাজিয়ে গান গাইতে দেখা যায়। তারা হতাহতদের প্রতি এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গান গাইছিল। স্পর্শকাতর পারমাণবিক স্থাপনা থাকায় ডিমোনা শহরটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুগুলোর একটি। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় সেনাবাহিনী এই ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাশ্রয় বা সংরক্ষণ করছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, ‘ইসরায়েলের আকাশ এখন অরক্ষিত।’ ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারে—এমন উদ্বেগ থেকেই মূলত ইরানের ওপর নতুন করে হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে ১২ দিনের সংঘাতের সময় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি ও লঞ্চার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের মজুতের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার থেকে কমে ১ হাজার ৫০০-এর নিচে নেমে আসে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান দ্রুতই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনব্যবস্থা আবারও সচল করেছে। বর্তমান যুদ্ধ শুরুর আগেই তাদের অন্তত ২ হাজার ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত ছিল।
আর্থিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ
ইসরায়েলের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত সহ্য করা সম্ভব নয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এক বছরের মধ্যেই ইরান এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে পারে। সামরিক স্পর্শকাতরতার কারণে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।
আইডিএফের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধের প্রথম ২৩ দিনে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সাফল্যের হার ছিল প্রায় ৯২ শতাংশ। গত রোববারের ব্যর্থতার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি তিনি, তবে উল্লেখ করেন যে ডিমোনা ও আরাদে হামলার জন্য প্রথাগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাঁরা আগে থেকেই চেনেন এবং এর আগে একাধিকবার প্রতিহত করেছেন।
প্রযুক্তিগত জটিলতা
ইসরায়েলের বহুমাত্রিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা মনে করা হয়, যা বিভিন্ন দিক থেকে আসা হামলা মোকাবিলা করতে সক্ষম। এর প্রতিটি স্তর আলাদা ধরনের হুমকি মোকাবিলায় বিশেষভাবে তৈরি। আয়রন ডোম স্বল্প পাল্লার রকেট ও গোলার জন্য; ডেভিডস স্লিং ব্যালিস্টিক ক্রুজ ও মাঝারি থেকে দীর্ঘ পাল্লার রকেটের জন্য এবং অ্যারো ২ ও অ্যারো ৩ দীর্ঘ পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত রুখতে ব্যবহৃত হয়।
ইসরায়েলি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক কমান্ডার রান কোচাভ বলেন, হামলা প্রতিহত করতে না পারার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। এর অন্যতম কারণ হলো ইসরায়েলি কমান্ডারদের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি মেনে চলতে হয়। তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, নির্দিষ্ট কোনো হুমকির মোকাবিলায় কোন ইন্টারসেপ্টরটি সবচেয়ে জুতসই হবে। দ্বিতীয়ত, রাডার ও ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থার মধ্যে অথবা এগুলোর অভ্যন্তরীণ সংযোগের ক্ষেত্রে কারিগরি বা প্রকৌশলগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে। তৃতীয় কারণটি হলো ‘পরিসংখ্যানগত বাস্তবতা’।
অর্থনৈতিক বিবেচনা
ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়াও একটি বড় কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি অ্যারো ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৩০ লাখ ডলার। ‘ডেভিডস স্লিং’ ইন্টারসেপ্টরের প্রতিটির দাম প্রায় ৭ লাখ ডলার এবং ‘আয়রন ডোম’-এর একেকটি ইন্টারসেপ্টরের খরচ পড়ে ৫০ থেকে ৭০ হাজার ডলার। অন্যদিকে একটি থাড ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ওপর হামলার প্রথম দুই দিনেই পেন্টাগন ৫৬০ কোটি ডলার মূল্যের গোলাবারুদ খরচ করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধের পরিকল্পনা করার সময় আইডিএফ নিশ্চিত করেছিল, দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের কাছে ‘পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর’ মজুত রয়েছে।
ভবিষ্যতের হুমকি
গত শুক্রবার ইরান ২ হাজার ৫০০ মাইল দূরে ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একটি যৌথ বিমানঘাঁটি রয়েছে। বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের মতে, ইরান এবারই প্রথম তাদের মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এ ঘটনায় ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, তারা এখন হঠাৎ করেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালে চলে এসেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট’-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো জেসন এইচ ক্যাম্পবেল বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা যদি আগের ধারণার চেয়ে বেশি হয়, তবে পেন্টাগনকে দ্রুত তাদের কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের পরিচালক টম কারাকো বলেন, ইরান সম্ভবত তাদের প্রচারের চেয়েও বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে। তিনি বলেন, ইরান ‘স্পেস লঞ্চ ভেহিকেল’ বা মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর যান তৈরি করছে, যা মূলত ক্ষেপণাস্ত্রেরই একটি ধরন।



