ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইরানকে সহায়তা করছে রাশিয়া
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক অভিযানে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে 'সামান্য' সাহায্য বলে উল্লেখ করলেও, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, তেহরান ও মস্কোর সামরিক সহযোগিতা 'ভালো' পর্যায়ে রয়েছে। এই বক্তব্য পূর্বের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে, যেখানে রাশিয়া ইরানকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানের অবস্থান-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের কথা বলা হয়েছিল।
স্যাটেলাইট তথ্য বিনিময় ও লিয়ানা সিস্টেম
পশ্চিমা সামরিক স্যাটেলাইটের শ্রেষ্ঠত্বের মুখে রাশিয়া তার একমাত্র সচল নজরদারি স্যাটেলাইট ব্যবস্থা 'লিয়ানা'র মাধ্যমে ইরানকে সহায়তা করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মার্কিন চিন্তন প্রতিষ্ঠান জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো পাভেল লুজিনের মতে, এই সিস্টেমটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ও অন্যান্য নৌবাহিনীর ওপর নজরদারি চালানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়া, ইরানের মহাকাশ কর্মসূচিতেও রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার বাইকনুর কসমোড্রোম থেকে উৎক্ষেপিত 'খৈয়াম' স্যাটেলাইটটি ভূপৃষ্ঠে এক মিটার বা তার চেয়ে বড় বস্তু চিহ্নিত করতে সক্ষম। লুজিনের মতে, মস্কো তাত্ত্বিকভাবে ইরানের অপটিক্যাল ইমেজিং স্যাটেলাইট থেকে তথ্য গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করতে পারে, যা তাদের কৌশলগত সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করে।
শাহেদ ড্রোনের আধুনিকায়নে রাশিয়ার ভূমিকা
ইউক্রেন যুদ্ধে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শাহেদ ড্রোনের ব্যবহার শুরু করে রাশিয়া। ধীরগতির কিন্তু কম খরচের এই আত্মঘাতী ড্রোনগুলোর উৎপাদন ও আধুনিকায়নে মস্কো সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ড্রোনগুলোকে দ্রুতগতিসম্পন্ন ও প্রাণঘাতী করার পাশাপাশি ক্যামেরা, নেভিগেটর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডিউল দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের টাইমস পত্রিকার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ মার্চ দক্ষিণ লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর ছোড়া একটি শাহেদ ড্রোন সাইপ্রাসে ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়, যাতে রাশিয়ার তৈরি স্যাটেলাইট নেভিগেশন মডিউল 'কমেটা-বি' ব্যবহার করা হয়েছিল। এই মডিউল অ্যান্টি-জ্যামিং শিল্ড হিসেবেও কাজ করে, যা ড্রোনগুলোর কার্যকারিতা বাড়ায়।
ইউক্রেন যুদ্ধের শিক্ষা ও কৌশলগত সহায়তা
ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাশিয়া ইরানকে কৌশলগত সহায়তা দিচ্ছে। ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহোর রোমানেঙ্কোর মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে রাশিয়া তেহরানকে গোয়েন্দা তথ্য, ডেটা, পরামর্শ এবং অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়া ইউক্রেনে পশ্চিমা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে ঝাঁকে ঝাঁকে আসল ও ডামি ড্রোন পাঠানোর কৌশলে পারদর্শী হয়ে উঠেছে, যা বর্তমানে ইরানকে উপসাগরীয় অঞ্চলের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সহায়তা করছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলিও ইরানের কৌশল ও সক্ষমতার পেছনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের 'অদৃশ্য হাত' থাকার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও রাশিয়ার স্বার্থ
ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করায় অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা রাশিয়ার জন্য লাভজনক হয়েছে। তেলের আকাশচুম্বী দাম পুতিনকে ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক সক্ষমতা এনে দিয়েছে। এছাড়া, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিয়ার জাহাজে পরিবাহিত তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন, যার ফলে রুশ তেলের দাম আরও বেড়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাশিয়া ইরানের সামরিক বিজয়ে খুব বেশি আগ্রহী নয়, বরং এই যুদ্ধ ইউক্রেনে পুতিনের নিজের যুদ্ধের জন্যই লাভজনক হয়ে উঠছে। নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের অ্যাসোসিয়েট ফেলো রুসলান সুলেইমানভের মতে, ক্রেমলিন 'এই যুদ্ধে বড় কোনো সাফল্য খুঁজছে না এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পরাজিত করতে ইরানকে সহায়তাও করছে না'। বর্তমান গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তাকে তিনি 'একটি শুভেচ্ছার নিদর্শন' বলে বর্ণনা করেছেন।
ইরানের নিজস্ব কৌশল ও সীমাবদ্ধতা
ইরানও বোঝে যে রাশিয়ার সহায়তা সীমিত এবং সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলই মিত্রোখিনের মতে, মার্চের শুরুর দিকে ইরান দিনে ২৫০টি পর্যন্ত ড্রোন ব্যবহার করলেও বর্তমানে তারা দিনে মাত্র ৫০টির মতো ড্রোন ছুড়ছে, যা তাদের সীমিত সম্পদ নির্দেশ করে।
তেহরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়া এবং তেলের দাম বাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার নিজস্ব কৌশলের ওপরই বেশি নির্ভর করছে। শেষ পর্যন্ত, ট্রাম্পের মূল্যায়ন—মস্কো সম্ভবত 'ইরানকে সামান্য সাহায্য করছে'—খুব একটা ভুল নয় বলে মনে হচ্ছে, যদিও এই 'সামান্য' সাহায্যই ইরানের সামরিক অভিযানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।



