ইরান যুদ্ধ বন্ধে চাপে পড়েছেন ট্রাম্প, সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে চুক্তিতে পৌঁছাতে সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাপে পড়েছেন। একদিকে অভ্যন্তরীণভাবে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জোরালো হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানকে ‘বিপজ্জনক আঞ্চলিক শক্তি’ হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা—এই দুই বিপরীত চাপের মধ্যে আটকে আছেন তিনি। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলা এই সংঘাতকে ট্রাম্প ‘সামান্য যাত্রাবিরতি’ বললেও বাস্তবে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কৌশল ও বিশ্ব অর্থনীতিতে ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাজার হাজার বিমান হামলার পরও ইরান সরকার টিকে আছে এবং পাল্টা কৌশল হিসেবে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চাইলেও বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট তার নির্ধারিত চীন সফর স্থগিত করেছেন এবং আশা করা হচ্ছে, মে মাসের মধ্যেই সংঘাতের ইতি টানতে চান তিনি। এদিকে মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা ১৫ দফার একটি শান্তি প্রস্তাবও সামনে এনেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায়। আটলান্টিক কাউন্সিলের সদস্য নেট সোয়ানসন বলেন, ইরানের মূল লক্ষ্য ছিল টিকে থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতে চাপ সৃষ্টি করা, যাতে ভবিষ্যতে এমন হামলা থেকে বিরত থাকে ওয়াশিংটন। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এখন চরমে। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের ৯৯ শতাংশ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হলেও বাকি ১ শতাংশ ঝুঁকি পুরো পরিস্থিতিকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে—যেমন একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিলিয়ন ডলারের জাহাজ ধ্বংস হয়ে যাওয়া। ইরান ইতোমধ্যে এই কৌশল কাজে লাগিয়ে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা দেখিয়েছে, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
সমঝোতার পথ অনিশ্চিত, মার্কিন জনমত যুদ্ধের বিপক্ষে
যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে মিশ্র বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প একদিকে দাবি করছেন আলোচনা ভালো চলছে, অন্যদিকে আরও হামলার ইঙ্গিতও দিচ্ছেন। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ইলান গোল্ডেনবার্গ বলেন, দুই পক্ষের অবস্থান এখনো একেবারেই বিপরীত মেরুতে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করুক, আর ইরান চায় ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ ও ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো শুরু থেকেই এই যুদ্ধ নিয়ে সংশয়ে ছিল। এখন তারা আরও উদ্বিগ্ন, কারণ সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দেশগুলো একদিকে যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও অন্যদিকে এখন চাইছে—যদি সংঘাত শুরু হয়েই থাকে, তবে সেটি ‘সম্পূর্ণভাবে শেষ’ করা হোক।
যুক্তরাষ্ট্রে জনমত ধীরে ধীরে যুদ্ধের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা গেছে, ৫৯ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ইরানে সামরিক পদক্ষেপ ভুল ছিল এবং ৬১ শতাংশ ট্রাম্পের কৌশলে অসন্তুষ্ট। এছাড়া সিবিএস নিউজ, ফক্স নিউজ ও রয়টার্স ইপসোস জরিপেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
মিশ্র সংকেত ও অনিশ্চয়তা, ভবিষ্যৎ অনির্দিষ্ট
যুদ্ধ বন্ধে ১০ দিনের জন্য কিছু হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। সম্ভাব্য স্থল অভিযানের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি সমঝোতা হলে তা শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই ইতিবাচক হবে।
সব মিলিয়ে, কূটনীতি, সামরিক চাপ এবং জনমতের ত্রিমুখী চাপে পড়ে ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে এখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনা, অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং আলোচনার অনিশ্চয়তা এই সংকটকে আরও গভীর করছে।



