মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নতুন ছন্দ: ইরানি হামলা, মার্কিন সেনা ও অস্থির জনজীবন
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নতুন ছন্দ: ইরানি হামলা ও অস্থিরতা

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নতুন ছন্দ: ইরানি হামলা, মার্কিন সেনা ও অস্থির জনজীবন

পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুদ্ধের এক নতুন ‘ছন্দ’ তৈরি হয়েছে, যেখানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কবার্তা আর নিয়মিত সাইরেনের শব্দের সঙ্গেই মানিয়ে নিতে শুরু করেছেন বাসিন্দারা। হামলার গতি কিছুটা কমলেও স্বস্তি নেই জনমনে। বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই বিশ্বাস প্রবল হচ্ছে যে, পরিস্থিতি ভালো হওয়ার আগে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ, মার্কিন সেনা মোতায়েন

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত কোনও অর্থবহ ফলাফল বয়ে আনতে পারেনি। এর মধ্যে হাজার হাজার মার্কিন সেনা এই অঞ্চলে পৌঁছাতে শুরু করেছে। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হুমকি দিয়ে রেখেছে যে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামোতে নতুন করে আঘাত হানবে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক বিশাল অগ্নিকাণ্ডের অপেক্ষায়, যার অর্থনৈতিক পরিণতি হতে পারে বিধ্বংসী। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত: প্রধান লক্ষ্যবস্তু

সংযুক্ত আরব আমিরাত এই যুদ্ধে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। দেশটির বর্তমান ইরানি শাসকদের সঙ্গে কোনও সমঝোতায় বিশ্বাসী নয়। তাদের মতে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এখন পুরোপুরি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমিরাতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নুরা আল কাবি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “গত এক মাস ধরে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে আইআরজিসি একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের মতো আচরণ করছে। তারা পুরো বিশ্বকে জিম্মি করে রেখেছে। তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি আরও বলেছেন, আইআরজিসি-র নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরান আর প্রতিবেশী হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা চাই না আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম প্রতিবেশীদের হুমকির মুখে বেড়ে উঠুক। আমরা এমন একটি গ্যারান্টি চাই যাতে এর পুনরাবৃত্তি আর কখনও না ঘটে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ

ইরান ইস্যুতে উপসাগরীয় ছয়টি রাজতন্ত্রের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি দুবাই, মানামা বা দোহায় ইরানের হামলাকে মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের বিপরীতে ‘একমাত্র যৌক্তিক বিকল্প’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ওমানই একমাত্র দেশ যারা ইরান ও তার প্রক্সি বাহিনীর হামলার নিন্দা জানিয়ে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে সই করতে অস্বীকার করেছে।

অন্যদিকে কাতার বিবৃতিতে সই করলেও তেহরানের প্রতি নমনীয় সুর বজায় রেখেছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাজেদ আল আনসারি বলেন, ইরান সবসময় প্রতিবেশী হিসেবেই থাকবে, তাই সহাবস্থানের পথ খুঁজে বের করা জরুরি। তবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করছে।

হুমকি মোকাবিলায় কৌশলগত ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে

কুয়েত ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হামাদ আলথুনায়িয়ান বলেন, “সবার কৌশলগত ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে। ইরানের আগ্রাসন বাড়লে এই দেশগুলোর সামনে হুমকি মোকাবিলা করা ছাড়া আর কোনও পথ থাকবে না।”

ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে হামলার হুমকি দেওয়ার পর ইরানও পাল্টা হুমকি দিয়েছে যে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পানি শোধনাগার এবং তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যদি আমিরাতের দাবি করা আবু মুসা এবং গ্রেটার ও লেসার তুনব দ্বীপগুলো দখল করার চেষ্টা করে, তবে ইরান ভয়াবহ প্রতিশোধ নেবে। পেন্টাগন ইতোমধ্যে এই অঞ্চলে ৫ হাজার মেরিন সেনার পাশাপাশি আরও ১০ হাজার পদাতিক সেনা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে।

অঞ্চলটি চরম অনিশ্চয়তার যুগে প্রবেশ করছে

আবুধাবিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এমিরেটস সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ-এর মহাপরিচালক সুলতান মোহাম্মদ আল নুয়াইমি বলেন, “অঞ্চলটি এখন এক চরম অনিশ্চয়তার যুগে প্রবেশ করছে। হয় সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়বে, না হয় কঠিন আলোচনার পথ ধরতে হবে যার সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।”

জনজীবন: স্কুল বন্ধ, অফিস খোলা, ব্যবসায় ধস

যুদ্ধের প্রভাবে আমিরাতের স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চললেও জনজীবন থমকে যায়নি। সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলো নিয়মিত সময়সূচী মেনেই চলছে। রেস্তোরাঁগুলোতে ভিড় থাকলেও আড্ডার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যুদ্ধ আর ভবিষ্যৎ আতঙ্ক।

দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্সিয়াল সেন্টারে (ডিআইএফসি) তিন সপ্তাহ আগে ড্রোন হামলা হয়েছিল। সেখানেও ব্যাংক ও অফিসগুলো পুনরায় খুলেছে। অডিট ফার্মে কর্মরত জ্যাকব বেনি বলেন, “এখন পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত, তাই মানুষ কাজে ফিরেছে। আশা করি শান্তি আলোচনার মাধ্যমে সব শেষ হবে।”

অর্থনৈতিক প্রভাব: তেল রফতানি বাধাগ্রস্ত, পর্যটন ধস

হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় তেল-গ্যাস রফতানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। পর্যটক কমে যাওয়া এবং বিমান চলাচল সীমিত হওয়ায় দুবাইয়ের স্বর্ণের বাজার এখন জনশূন্য। ব্যবসায়ী জগদীশ সনি বলেন, “কেউ কিছু কিনছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে তিন-চার মাস সময় লাগতে পারে।”

দুবাইভিত্তিক মাজিদ আল ফুতাইম গ্রুপের সিইও আহমেদ জালাল ইসমাইল জানান, ঈদের তিন দিনের ছুটিতে তাদের সিনেমা হলগুলোতে প্রায় ৫ লাখ মানুষ এসেছে। ওমান ও সৌদি আরবের বিকল্প সড়কপথ ব্যবহার করায় বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহও স্বাভাবিক রয়েছে। ইসমাইল বলেন, “বাজারে সব ধরণের খাবার পাওয়া যাচ্ছে। হয়তো বিশেষ কোনও গ্রেডের অস্ট্রেলিয়ান পণ্য খুঁজে না-ও পেতে পারেন, তবে তা সাময়িক।”

তবুও তিনি সতর্ক করে বলেন, সামনের দিনগুলো চরম অনিশ্চয়তায় ভরা। এই যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে এবং কীভাবে শেষ হবে, তা আগে থেকে বলা অসম্ভব।