ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে সময়সীমার চাপ, হরমুজ প্রণালি সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের দোদুল্যমানতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে নিজের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় চাপের মুখে পড়েছেন। একদিকে যুদ্ধ থামানোর অভ্যন্তরীণ চাপ, অন্যদিকে ইরানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে তাদের শক্তি প্রদর্শন—এই দুই বিপরীতমুখী চাপে ট্রাম্প এখন কোণঠাসা। বৃহস্পতিবার ট্রাম্প যাকে ‘সামান্য যাত্রাবিরতি’ বলে বর্ণনা করেছেন, সেই সংঘাতের প্রায় চার সপ্তাহ শেষ হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাজার হাজার বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরানের সরকার ক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে।
ইরানের অনমনীয় অবস্থান ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ
ইরান যুদ্ধ টেনে নিতে চাইছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো টিকে থাকা এবং ট্রাম্পের চেয়ে বেশি সময় মাঠে থাকা। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত হেনে একটি শিক্ষা দিতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে এমন পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে, যা তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। ইরানি নেতারা জনসমক্ষে দাবি করছেন, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে আর কখনো হামলা না করার অঙ্গীকার করতে হবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের দোদুল্যমান অবস্থার চিত্র ফুটে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘ধরা যাক আমরা ৯৯ শতাংশ লক্ষ্য অর্জন করলাম, কিন্তু বাকি ১ শতাংশ অর্জনযোগ্য নয়। ওই ১ শতাংশের মানে হলো একটি ক্ষেপণাস্ত্র ১০০ কোটি ডলার মূল্যের জাহাজে আঘাত হানা।’ এই অসম ব্যবধান ইরানের জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বোমা হামলা সত্ত্বেও ইরান সামরিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চাপ ও জনমত
ট্রাম্প এবং তাঁর শীর্ষ সহযোগীরা দ্রুত যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে চান, যার সময়সীমা চার থেকে ছয় সপ্তাহ ধরা হয়েছিল। তবে জনমত যুদ্ধের বিরুদ্ধে গড়ে উঠছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ৫৯ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ইরানে সামরিক শক্তি ব্যবহার ভুল ছিল, এবং ৬১ শতাংশ ট্রাম্পের সংকট মোকাবিলার কৌশলে অসন্তুষ্ট। ফক্স নিউজ, কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটি, সিবিএস নিউজ এবং রয়টার্স-ইপসোসের জরিপেও যুদ্ধের বিরোধিতার হার ৫৪ থেকে ৬১ শতাংশের মধ্যে দেখা গেছে।
ট্রাম্পের রিপাবলিকান সমর্থকরা যুদ্ধের পক্ষে থাকলেও নিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে বিরোধিতার হার বেশি। সাধারণ আমেরিকানরা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা রুখে দেওয়ার পক্ষে থাকলেও, অনেকেই মনে করেন এটি একটি ‘ইচ্ছাকৃত চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ’ যা আমেরিকাকে কম নিরাপদ করবে।
চুক্তির সম্ভাবনা ও আঞ্চলিক উদ্বেগ
কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ এখনো অনিশ্চিত, তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন আলোচনা ভালোভাবেই এগোচ্ছে। তিনি ইরানের জ্বালানি স্থাপনা ধ্বংসের অভিযান ১০ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন, যা সমঝোতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ইলান গোল্ডেনবার্গ বলেন, দুই পক্ষের মধ্যকার ব্যবধান বিশাল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, অন্যদিকে ইরানের দাবি ক্ষতিপূরণ ও মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাওয়া।
পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, যারা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, তারা এই যুদ্ধ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা যুদ্ধ চায়নি এবং এটি থামানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এখন আশঙ্কা করছে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরান তাদের জনগণের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। গোল্ডেনবার্গের মতে, এই দেশগুলো ‘পুরোপুরি বিপর্যয়ের’ মুখে পড়েছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কাজটি পুরোপুরি শেষ করতে’ বলছে, যদিও এর স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা কঠিন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সামরিক পদক্ষেপ
যখন আরও কয়েক হাজার মার্কিন মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাচ্ছে, তখন যুদ্ধ কত দ্রুত শেষ হবে তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন মিশ্র বার্তা দিচ্ছে। অতিরিক্ত বাহিনী পাঠানো একটি স্থল অভিযানের ইঙ্গিত হতে পারে, যা ওয়াশিংটনের জন্য ঝুঁকি বাড়াবে। ট্রাম্পকে ইরানের ইউরেনিয়াম জব্দ বা খারগ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, কিন্তু তিনি সরাসরি উত্তর দেননি।
ইরানিদের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা দেখতে হবে। যদি ইরানকে বোঝানো যায় যে মৃত্যু ও ধ্বংস ছাড়া তাদের সামনে ভালো বিকল্প নেই, তবে একটি চুক্তি সম্ভব। এদিকে, ট্রাম্প ইরানি প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পাওয়া ‘উপহার’ হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আটটি তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতির কথা উল্লেখ করেছেন, যা আলোচনার অগ্রগতির ইঙ্গিত দিতে পারে।
শুক্রবার এশিয়ার শেয়ারবাজারে সামান্য পতন দেখা গেছে, যা জ্বালানি স্থাপনায় হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা সত্ত্বেও আর্থিক বাজারে উদ্বেগ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, ট্রাম্পের সময়সীমার চাপ, ইরানের অনমনীয় অবস্থান এবং আঞ্চলিক উদ্বেগ যুদ্ধবিরতি চুক্তির পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



