ঈদের দিন সন্তান কাঁধে নিয়ে মিষ্টি কিনতে যাওয়া ওসামাকে ধরে নিয়ে গেল ইসরাইলি বাহিনী
গাজা উপত্যকায় ঈদুল ফিতরের উৎসবের দিন এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। ২৫ বছর বয়সি ওসামা আবু নাসের সকালে তার ২১ মাস বয়সি শিশু সন্তান জাওয়াদকে কাঁধে নিয়ে মিষ্টি কিনতে বের হয়েছিলেন। কিন্তু ইসরাইলি সামরিক বাহিনী তাকে আটক করে নিয়ে যায়, এবং এখনও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। শিশুটিকে যদিও ফেরত দেওয়া হয়েছে, তবে তার শরীরে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে বলে পরিবার ও চিকিৎসকরা দাবি করেছেন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
মিডলইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯ মার্চ কেন্দ্রীয় গাজা থেকে ওসামা ও তার শিশু সন্তানকে আটক করা হয়। ওসামার পরিবারের সদস্যদের মতে, যুদ্ধের সময় বাড়ি, সন্তান ও জীবিকা হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। ঈদের দিন সকাল ১০টার দিকে তিনি শিশুটিকে নিয়ে বের হন মিষ্টি কেনার উদ্দেশ্যে।
ওসামার বাবা মুহাম্মদ হুসনি আবু নাসার জানান, তার ছেলে পশ্চিম দিকের পরিবর্তে পূর্ব দিকে যাচ্ছিল, যা একটি নিষিদ্ধ সামরিক সীমারেখার দিকে পরিচালিত হয়। এই ‘ইয়েলো লাইন’ এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবেশীরা তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, এবং ওসামা সেখানে পৌঁছানোর পর ইসরাইলি বাহিনী তার আশেপাশে গুলি ছুড়তে থাকে।
আটকের দৃশ্য ও পরবর্তী ঘটনা
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুসারে, একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন ওসামার কাছে আসে, এবং তাকে শিশুটিকে নামিয়ে সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। ওসামার বাবা বলেন, তিনি শুধু অন্তর্বাস পরিহিত অবস্থায় ছিলেন এবং সম্পূর্ণ শান্তভাবে আচরণ করেছিলেন, কোনো আক্রমণাত্মকতা দেখাননি।
ওসামা আটক হওয়ার খবর পেয়ে তার বাবা মুহাম্মদ আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে আসেন। প্রায় ১০ ঘণ্টা পর আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) তাকে ফোন করে জানায় যে, তার নাতি জাওয়াদকে তারা পেয়েছে। মাঘাজি বাজার এলাকায় আইসিআরসির গাড়ি থেকে শিশুটিকে একটি কম্বলে জড়িয়ে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
শিশুটির নির্যাতনের প্রমাণ
কম্বল খুলে পরিবার শিশুর প্যান্টে রক্তের দাগ দেখতে পায়, যা ওসামার কাঁধের আঘাতের বলে দাবি করা হয়। তবে বাড়িতে আনার পর শিশুটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ধরা পড়ে। হাঁটুর চারপাশে পোড়া দাগ এবং ধারালো বস্তু দ্বারা সৃষ্ট গভীর ক্ষত ছিল বলে পরিবার জানায়।
শিশুটি সারারাত ব্যথা ও ভয়ে কেঁদেছে, ঘুমাতেও পারেনি। পরদিন তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন যে, এসব আঘাত গোলাবারুদের কারণে নয়, বরং নির্যাতনের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। চিকিৎসা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তার হাঁটু ফুলে গেছে এবং উভয় হাঁটুর চারপাশে সিগারেটের দাগের মতো ক্ষত রয়েছে।
ইসরাইলি বাহিনীর প্রতিক্রিয়া
ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে অস্বীকার করেছেন এবং এটিকে হামাসের প্রচারণার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে আইসিআরসি নিশ্চিত করেছে যে, তারা শিশুটিকে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গ্রহণ করে পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে শিশুটির শারীরিক বা মানসিক অবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করেনি।
এই ঘটনা গাজায় চলমান সংঘাতের পটভূমিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।



