ইরানে যুদ্ধের কালো ছায়া: সাধারণ মানুষের উপর মার্কিন-ইসরাইলি হামলার নির্মম পরিণতি
ইরানে যুদ্ধের কালো ছায়া: সাধারণ মানুষের নির্মম পরিণতি

ইরানে যুদ্ধের কালো ছায়া: সাধারণ মানুষের উপর মার্কিন-ইসরাইলি হামলার নির্মম পরিণতি

গত তিন সপ্তাহ ধরে ইরানের আকাশে অবিরাম গর্জন উঠছে মার্কিন ও ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের। তেহরান থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন শহরে চলছে ধ্বংসযজ্ঞ। কিন্তু এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড়ো মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ ইরানি নাগরিকদের। ওষুধের দোকানের কর্মী, অনলাইন উদ্যোক্তা, এমনকি তিন বছরের শিশু পর্যন্ত পড়ছেন মৃত্যুর মিছিলে।

যারা চিরতরে হারিয়ে গেলেন

পারাশতেশ দাহাঘিন তেহরানের আপাদানা এলাকার একটি ওষুধের দোকানে কাজ করতেন। মার্চের এক দিন হঠাৎই তার কাছের একটি তথ্যপ্রযুক্তি ভবনে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। বিস্ফোরণের আঘাতে তখনই প্রাণ হারান দাহাঘিন। তার ভাই পূরিয়া ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, "তুমি মহান ছিলে।" পরিবার তাকে বিপদ এড়াতে বললেও দাহাঘিন জবাব দিয়েছিলেন, "মানুষের প্রয়োজন আমাকে। অনেক মানুষ আঘাত পেয়েছেন। তারা ওষুধের দোকানে আসছেন।"

অন্যদিকে ২৬ বছর বয়সি বেরিভিয়ান মোলানি ছিলেন একজন অনলাইন উদ্যোক্তা। পোশাকের দোকান চালাতেন, লাইফস্টাইল ব্লগও লিখতেন। নিরাপদ উত্তর ইরান ছেড়ে মাত্র একদিন আগে তেহরানে ফিরেছিলেন তিনি। ১৭ মার্চের রাতে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তার বাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থাতেই প্রাণ হারান মোলানি। মজার ব্যাপার হলো, তার পরিবার জানতেই পারেনি যে তাদের বাড়ির উল্টোদিকে থাকেন ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী এসমাইল খাতিব, যিনি ছিল হামলার লক্ষ্য।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না

তিন বছর বয়সি এইলমাহ বিল্কির কথা খুব কমই জানা যায়। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর শারদাশতে মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ভয়ানক আহত হওয়ার একদিন পরেই মারা যায় এই কন্যাশিশুটি। তার ছবি বিবিসিকে সরবরাহ করেছে কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেনগাও।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এদিকে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছিল দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের একটি প্রাথমিক স্কুলে। কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেনগাও ওই স্কুলে নিহত ৪৮টি শিশু এবং দশজন প্রাপ্তবয়স্ককে চিহ্নিত করতে পেরেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এখনও প্রকাশ্যে এই হামলার কথা স্বীকার করেনি, শুধু বলেছে তারা তদন্ত করছে।

মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংক্রান্ত সংবাদ সংস্থা এইচআরএএনএ এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ বেসামরিক মানুষের মৃত্যু নথিবদ্ধ করেছে, যার মধ্যে ১৫ শতাংশই শিশু। ইরানের মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ডকুমেন্টেশন সেন্টার জানাচ্ছে, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার সঙ্গে জড়িত একটি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার ভবনেই হামলা চালানো হয়েছিল যেখানে দাহাঘিন কাজ করতেন।

হেনগাওয়ের আওয়ার শেখি বলছিলেন, "সাধারণ মানুষের জন্য এ এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। মানুষ আতঙ্কে আছেন। এবছরই, আগের দিকে ইরানের সরকার মানুষকে রাস্তায় মেরে ফেলেছে, এখন তারা বোমা হামলায় মৃত্যুর ঝুঁকির মুখে পড়েছে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে সাধারণ মানুষের বসবাসের এলাকায় সরকারি ভবন রয়েছে আর তেহরানের মতো বড়ো শহরেও কোনো বম্ব-শেল্টার নেই।

স্বাস্থ্য পরিষেবায় আঘাত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও নিশ্চিত করেছে যে, ২০টিরও বেশি স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী স্থাপনার ওপর হামলা হয়েছে। অন্তত নয়জন স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারীর মৃত্যু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনকারী আয়ান ক্লার্ক বলেন, "স্বাস্থ্য পরিষেবায় যেকোনো ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।"

বিবিসি যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে তেহরানের ১৭ তলা গান্ধী হাসপাতাল, পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মাহাবাদের রেড ক্রিসেন্ট পরিচালিত হাসপাতাল এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী বুশেহরের একটি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বুশেহরের হাসপাতালের ভিডিওতে দেখা গেছে, ইনকিউবেটরে থাকা সদ্যোজাতদের বাইরে বের করে আনা হচ্ছে।

তথ্য প্রবাহে বাধা

যুদ্ধের কালো ধোঁয়া ওঠা আর ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইরানের অভ্যন্তর থেকে সামান্যই তথ্য বাইরে বেরিয়ে আসছে। হেনগাও বলছে, ইরানের কোনো নাগরিককে ইরাকি ফোন দিয়ে ইরাকের ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেখলেই গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইরানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে। ইরানের প্রশাসন চায় যে তাদের নাগরিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকুক, এবং তারা যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারি ভাষ্যটাই জানুক।

ইরানের শল্যচিকিৎসক হাশিম মোয়াজেনজাদেহ্, যিনি বর্তমানে ফ্রান্সে চিকিৎসা করেন কিন্তু তেহরানে তার পুরানো সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, বলেন "যেসব বোমা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো বিরাট আকারের। বহুসংখ্যক বেসামরিক মানুষ মারা যাচ্ছেন।"

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রতিনিধিদলের প্রধান ভিনসেন্ট কাসার্ড স্পষ্ট করে বলেন, "আন্তর্জাতিক মানবিক আইনটা স্পষ্ট – বেসামরিক নাগরিক এবং বেসামরিক অবকাঠামো হামলার বাইরে থাকবে। স্বাস্থ্য কর্মী এবং উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা পরিবহন আর স্থাপনাগুলি এবং মানবিক পরিষেবা দেওয়া ব্যক্তিদের সম্মান দিতে হবে, তাদের সুরক্ষা দিতে হবে।"

ইরান কখনই নিজেদের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান প্রকাশ করে না। তবে মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানাচ্ছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ১ হাজার ১৬৭ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছে, অন্যদিকে হেনগাও জানাচ্ছে যে ওই সংখ্যাটি পাঁচ হাজারেরও বেশি।

যুদ্ধের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সাধারণ ইরানি নাগরিকরা প্রতিদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। পারাশতেশ দাহাঘিন, বেরিভিয়ান মোলানি, এইলমাহ বিল্কি – এরা শুধু কয়েকটি নাম মাত্র। তাদের পেছনে আছে হাজার হাজার অজানা নাম, যাদের কথা হয়তো কখনোই জানা যাবে না এই যুদ্ধের কালো ধোঁয়ার আড়ালে।