তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের কঠোর হুঁশিয়ারি: ইরান-ইসরায়েল সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করছে
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জন্য একটি গভীর অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি সরাসরি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে এই সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি বৃহস্পতিবার এই খবর নিশ্চিত করেছে।
অঞ্চলের বেদনাদায়ক সময়ের মুখোমুখি
আঙ্কারায় ক্ষমতাসীন একে পার্টির এক সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে এরদোয়ান বলেন, এই যুদ্ধ গত এক শতাব্দীর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যকে সবচেয়ে বেদনাদায়ক সময়ের মুখোমুখি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধের ফলে আমাদের অঞ্চল এখন রক্ত আর বারুদের গন্ধে ডুবে যাচ্ছে। নিষ্পাপ শিশুরা তাদের শ্রেণিকক্ষে বসে ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।’ তার মতে, এই পরিস্থিতি মানবিক মূল্যবোধকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নেতানিয়াহু সরকারের পরিকল্পনার অভিযোগ
তুর্কি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহু সরকার কেবল ইরানকে লক্ষ্য করেই থেমে নেই, বরং তারা ধাপে ধাপে লেবানন দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এরদোয়ান প্রশ্ন তোলেন, গত ২৭ দিন ধরে যারা সব আন্তর্জাতিক নীতি ও আদর্শ লঙ্ঘন করে হামলা চালাচ্ছে, তাদের কাছে মানুষের পরিচয়ের কি কোনও মূল্য আছে? তিনি বলেন, ‘আগ্রাসীদের চোখে আমরা শিয়া না সুন্নি, তুর্কি, কুর্দি, আরব নাকি ফার্সি তাতে কি কিছু যায় আসে? ইস্পাহান ও তেহরানে ঝরা চোখের জল আর এরবিল, বাগদাদ, বৈরুত বা রিয়াদের কান্নার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?’
জাতিগত বিভেদ উসকে দেওয়ার কৌশল
এরদোয়ান অঞ্চলে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ উসকে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, জায়নবাদী কৌশলের লক্ষ্যই হলো ‘বিভক্ত করো ও শাসন করো’ নীতি প্রয়োগ করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বোমা আর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন থেমে যাওয়ার পরও আমাদের এই ভৌগোলিক এলাকাতেই একসঙ্গে বসবাস করতে হবে। এই বাস্তবতাকে কেউ যেন ভুলে না যায়।’ তার মতে, এই সংঘাতকে মূলত ‘ইসরায়েলের যুদ্ধ’ হিসেবে দেখা উচিত, যার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে মুসলিমদের এবং শেষ পর্যন্ত পুরো মানবজাতিকে।
আল-আকসা মসজিদে বাধার নিন্দা
তুর্কি প্রেসিডেন্ট আল-আকসা মসজিদে মুসলিমদের ইবাদতে বাধা দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম পবিত্র এই স্থানে ঈদের নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়নি। এরদোয়ান একে ২০০ কোটি মুসলমানের বিশ্বাসের ওপর এক ‘ধৃষ্টতাপূর্ণ হামলা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি এই যুদ্ধকে ‘বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে যাওয়া একটি গণহত্যার নেটওয়ার্ক’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যারা ধর্মীয় যুক্তির আড়ালে পুরো ভূগোলকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
তুরস্কের অঙ্গীকার: শান্তি ও স্থিতিশীলতা
প্রতিবেশী দেশগুলোর বিপদে তুরস্ক কখনোই চুপ থাকবে না জানিয়ে এরদোয়ান বলেন, ‘বন্ধু ও ভাই হিসেবে আমরা কাউকে কঠিন সময়ে একা ছেড়ে দিই না। শান্তি ও স্থিতিশীলতার নীতি থেকে তুরস্ক এক চুলও পিছিয়ে আসবে না।’ তার এই বক্তব্য তুরস্কের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দৃঢ় প্রত্যয়কে প্রতিফলিত করে।



