যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় ইরান ও লেবাননে মানবিক বিপর্যয়
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মুখে ইরান ও লেবাননে এক ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির প্রায় ৩২ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ। অন্যদিকে লেবাননে ইসরাইলি স্থল অভিযানের মুখে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরও ১০ লাখ মানুষ। দুই দেশ মিলিয়ে বর্তমানে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ লাখ, যা একটি বিশাল মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরানে ধ্বংসযজ্ঞ ও মৃত্যুর মিছিল
ইরানে গত ২৭ দিনের যুদ্ধে অন্তত এক হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধের ভয়াবহতায় ইরানের অভ্যন্তরে ৮৫ হাজারেরও বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
- ২৮২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র
- ৬০০ স্কুল
- প্রায় ৬৫ হাজার ঘরবাড়ি
রাজধানী তেহরানেই অন্তত ১৪ হাজার আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা শহরের অবকাঠামোকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, হামলা শুরুর পর থেকে ইরানের সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দেশের ভেতরেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটছেন। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, তুরস্ক ও আজারবাইজান সীমান্ত বর্তমানে স্থিতিশীল থাকলেও ইরান ত্যাগ করা মানুষের চাপ দিন দিন বাড়ছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
লেবাননে নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতি
লেবাননের পরিস্থিতিও ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে লিটানি নদী থেকে জাহরানি নদী পর্যন্ত এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়ায় দেশটির প্রায় ১৪ শতাংশ ভূখণ্ড এখন জনশূন্য। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের মতে, লেবাননের প্রতি পাঁচজন বাসিন্দার মধ্যে একজন বর্তমানে বাস্তুচ্যুত। আশ্রয়ের অভাবে অনেক পরিবারকে খোলা আকাশ, রাস্তা বা যানবাহনে রাত কাটাতে হচ্ছে, যা তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। গত দুই সপ্তাহে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ লেবানন ছেড়ে সিরিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন, যাদের অর্ধেকই শিশু, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক।
সেতু ধ্বংস ও বিচ্ছিন্নতার চক্রান্ত
যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে। কাসমিয়েহ, আল-কানতারা এবং খর্দালিসহ বেশ কয়েকটি প্রধান সেতুতে বোমা হামলা চালানো হয়েছে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই হামলার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এটি দক্ষিণ লেবাননকে দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি ‘বাফার জোন’ বা বাফার অঞ্চল তৈরির চক্রান্ত। এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য পালানোর পথ যেমন সংকুচিত হচ্ছে, তেমনি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছান অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা মানবিক সহায়তাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এই সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও মানবিক সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়।



