ইরানের হামলায় পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস: নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর দাবি
মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, ইরানের হামলায় পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যদিও মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
ঘাঁটি ধ্বংসের বিস্তারিত তথ্য
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধ্বংসপ্রাপ্ত ১৩টি সামরিক ঘাঁটির মধ্যে কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে নিম্নলিখিত ঘাঁটিগুলো:
- কুয়েতের পোর্ট শুয়াইবা সামরিক ঘাঁটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
- আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- বুয়েরিং সামরিক ঘাঁটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন সেনারা এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘাঁটি ছেড়ে অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছেন, যা যুদ্ধ পরিস্থিতির জটিলতা নির্দেশ করে।
অন্যান্য দেশে হামলা ও মার্কিন প্রতিক্রিয়া
ইরান কেবল কুয়েতেই নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
- কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি: এই ঘাঁটিতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী রাডার ব্যবস্থা ইরানের হামলায় ধ্বংস হয়েছে। এটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের আঞ্চলিক সদর দপ্তর হিসেবে পরিচিত।
- বাহরাইনে মার্কিন সেনাবাহিনীর ফিফ্থ ফ্লিটের সদর দপ্তর: এখানেও ইরান সফল হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
- সৌদি আরবে প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটি: এই ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়েছে, যা ইরানের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করে।
উল্লেখ্য, ইরান আগেই উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, তারা যদি আমেরিকা এবং ইসরাইলকে সহযোগিতা করে, তবে তাদেরও রেহাই দেওয়া হবে না। এই হামলাগুলো সেই হুঁশিয়ারির বাস্তবায়ন বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন বারবারই ইরানের দাবিগুলোকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দিয়েছে। তবে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন এই বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে, কারণ এটি সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উপস্থাপন করেছে।
মার্কিন সামরিক কৌশল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
যদিও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম এশিয়ায় তার সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরাক এবং আফগানিস্তানে যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় অঞ্চলে তৈরি করা এই সেনাঘাঁটিগুলোতে ইরানের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানা আটকানোর মতো পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ছিল না, যা একটি গুরুতর নিরাপত্তা ফাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম এশিয়ায় আরো সেনা মোতায়েন করা জারি রেখেছে। আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর প্রায় চার সপ্তাহে এসে অঞ্চলটিতে মার্কিন উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে যে, বিমান হামলায় ইরানের ৯ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।
বর্তমানে অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ বিভিন্ন স্ট্রাইক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে মেরিন বাহিনী ও প্যারাট্রুপার মোতায়েন করছে, যা তার সামরিক প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা নির্দেশ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিশদ
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র তিনটি প্রধান বাহিনী মোতায়েন করছে, যাতে অতিরিক্ত প্রায় ৭ হাজার সেনা যুক্ত হয়েছে:
- ত্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ: এই গ্রুপে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেরিন সদস্য রয়েছে, যারা আকাশ ও সমুদ্রপথে দ্রুত অভিযান চালাতে সক্ষম।
- বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ: এখানেও প্রায় একই সংখ্যক মেরিন ও নৌসদস্য রয়েছে, যা মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শক্তিশালী করছে।
- ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনী: এই সদস্যরা বিশ্বের যেকোনো স্থানে স্বল্প সময়ের মধ্যে মোতায়েনের সক্ষমতা রাখে, যা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এই সামরিক বৃদ্ধি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের হামলার পরও পশ্চিম এশিয়ায় তার প্রভাব বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে, যেখানে যুদ্ধের পরিণতি আরো গভীর ও বিস্তৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।



