ইরান উত্তেজনায় ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভ, যুক্তরাজ্যের বিমানবাহী রণতরীকে বললেন 'খেলনা'
ইরান উত্তেজনায় ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভ, যুক্তরাজ্যের রণতরী 'খেলনা'

ইরান উত্তেজনায় ন্যাটো নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের তীব্র ক্ষোভ

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার জন্য বারবার আহ্বান জানালেও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই উত্তেজনার মধ্যেই তিনি যুক্তরাজ্যের বিমানবাহী রণতরীকে সরাসরি 'খেলনা' বলে উপহাস করেছেন, যা দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, "আমাদের সেটি (রণতরী) লাগবে না, বিরক্ত হয়ো না।"

যুক্তরাজ্যের রণতরী প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন যে তিনি যুক্তরাজ্যের কাছে দুটি বিমানবাহী রণতরী চেয়েছিলেন। তবে, কেইর স্টারমার প্রথমে এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং পরবর্তীতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। মজার বিষয় হলো, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই বিষয়ে কোনো প্রকার মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা না এমন কোনো অনুরোধ করা হয়েছে তা স্বীকার করেছে, আর না অস্বীকার করেছে।

এর আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হামলার জন্য যুক্তরাজ্যের ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেবেন না। তবে, দিয়াগো গার্সিয়াসহ কিছু কৌশলগত ঘাঁটি ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা মোকাবিলার জন্য শুধুমাত্র প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা

সাইপ্রাসে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের রাফ ঘাঁটির দিকে লেবানন থেকে ইরানের তৈরি একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনার পরই যুক্তরাজ্য 'এইচএমএস ড্রাগন' নামের একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পাঠিয়েছে। এমনকি, ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে একটি রয়েল নেভির জাহাজ বা বেসামরিক জাহাজ মোতায়েন করার বিষয়টিও গভীরভাবে বিবেচনা করছেন।

এই প্রণালির বন্ধ হয়ে যাওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। প্রস্তাবিত জাহাজটি মাইন অপসারণকারী ড্রোনগুলোর জন্য একটি 'মাদারশিপ' হিসেবে কাজ করবে বলে জানা গেছে।

দিয়াগো গার্সিয়া ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ভারত মহাসাগরের চাগোস দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত দিয়াগো গার্সিয়া ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। সম্প্রতি, এই কৌশলগত ঘাঁটিটি লক্ষ্য করে ইরান দুটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তবে, সৌভাগ্যবশত আঘাত হানার আগেই ক্ষেপণাস্ত্র দুটিকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়। এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনাকেও তাচ্ছিল্যভরে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে বলেছেন, "ইরান আড়াই হাজার মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তবে, তাদের এত দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মত ক্ষেপণাস্ত্র নেই। কিন্তু, তারা এখন সেই বহুল আলোচিত দ্বীপটিকেই লক্ষ্য করে হামলা করেছে, যেটি আমাদের দিতে যুক্তরাজ্য খুবই ভয় পাচ্ছিল।"

ন্যাটো জোট নিয়ে ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা

ট্রাম্প আরও যোগ করেন, "আমি ন্যাটো মিত্রদের ওপর গভীরভাবে হতাশ। আসলে তাদের মধ্যে কয়েকজন এমন মন্তব্য করেছে, যুদ্ধ শেষ হলে তারা জড়িত হতে চাই। না, জড়িত হওয়ার কথা যুদ্ধের শুরুতেই, এমনকি শুরু হওয়ার আগেই।"

যুক্তরাজ্যের বিমানবাহী রণতরী প্রসঙ্গে ট্রাম্পের ভাষা ছিল আরও কর্কশ: "আমরা যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে শুনেছি—এটা তিন সপ্তাহ আগের কথা—'আমরা আমাদের বিমানবাহী রণতরী পাঠাবো, যেগুলো আবার খুব ভালো মানের নয়।' আমাদের যেগুলো আছে, সেগুলোর তুলনায় এগুলো খেলনার মতো। তারা আমরা যুদ্ধ শেষ হলে বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর কথা বলেছে। আমি তাদের বলে দিয়েছি, অনেক ধন্যবাদ। বিরক্ত হওয়ার দরকার নেই। আমাদের এটা দরকার নেই।"

এখন সবাই সাহায্য করতে চাইছে জানিয়ে ট্রাম্প বিদ্রূপাত্মক সুরে বলেন, "যখন তারা ধ্বংস হয়ে গেছে, অন্য পক্ষও ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন তারা বলছে, আমরা জাহাজ পাঠাতে খুবই আগ্রহী।"

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি

চলতি সপ্তাহের শুরুতে কেইর স্টারমার সংসদ সদস্যদের একটি কমিটিকে জানান, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারবার করা অপমানজনক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতে চান না। গত সেপ্টেম্বর মাসে দ্বিতীয়বারের মত রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই সফরের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো নিয়েও কোনোভাবেই খুশি নন ট্রাম্প। নিজের প্রথম মেয়াদেও এই জোট থেকে বের হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। দ্বিতীয়বার মসনদে বসার পরও জোটটির দিকে তীর্যকভাবে কথা বলেছেন এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোকে 'ভীতু' ও 'কাগুজে বাঘ' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন তিনি, যা ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে।

যুক্তরাজ্য দীর্ঘমেয়াদী ইজারা চুক্তির মাধ্যমে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করতে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তি নিয়েও ট্রাম্প সম্প্রতি বেশ কঠোর সমালোচনা করে আসছেন। ইরান সংকট, ন্যাটো জোটের ভূমিকা এবং যুক্তরাজ্যের সাথে সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয়েই মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থান দিন দিন আরও কঠোর হয়ে উঠছে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।