মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নতুন কৌশল: ইরান ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শিখে এফপিভি ড্রোন ব্যবহার করছে
ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত ফাইবার অপটিক তার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ড্রোন বা এফপিভি এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কৌশল বদলে দিচ্ছে। ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়ারা সম্প্রতি বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘাঁটির ওপর এফপিভি ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ইরান রাশিয়ার কাছ থেকে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শিখছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের শিক্ষা কাজে লাগাচ্ছে ইরান
২০২৪ সালের শেষ দিকে রাশিয়া ইউক্রেনের কুরস্ক অঞ্চলে তার-নিয়ন্ত্রিত ড্রোন ব্যবহার শুরু করে। পশ্চিমা ও ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, মস্কো ইরানের নকশা করা দূরপাল্লার ‘শাহেদ’ ড্রোনগুলোকে আরও আধুনিক করেছে এবং তেহরানের সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তি বিনিময় করছে। কিয়েভভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠানের প্রধান আন্দ্রি জাগোরোদনিয়ুক বলেন, ‘রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে একটি জোট রয়েছে। তারা অভিজ্ঞতা, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তি বিনিময় করছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে মার্কিন বাহিনী এফপিভি ড্রোনের বিরুদ্ধে প্রস্তুত নয়। কার্নেগি এনডাউমেন্টের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কফম্যান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইউনিটগুলো এফপিভি প্রযুক্তি বোঝার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতায় পৌঁছাতে আমাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।’
যুক্তরাজ্যের বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল মার্টিন স্যাম্পসন বলেন, পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা যেকোনো মার্কিন সেনা বা যুদ্ধজাহাজ এফপিভি ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন বাহিনীতে ড্রোন আক্রমণ ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব রয়েছে।
ড্রোন যুদ্ধের ধরন বদলে দিচ্ছে
এফপিভি ড্রোন ছাড়াও যুদ্ধের কৌশলে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ইউক্রেন সমুদ্রপথে ড্রোন ব্যবহার করে রুশ যুদ্ধজাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যা ইরানের জন্য একটি উদাহরণ। যদিও ইরানের সামুদ্রিক ড্রোনগুলো ইউক্রেনের মতো উন্নত নয়, তবু হরমুজ প্রণালির মতো সরু জলপথে এগুলো যুদ্ধজাহাজের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এফপিভি ড্রোনকে রণক্ষেত্রের বেশির ভাগ হতাহতের কারণ হিসেবে দেখা গেছে, যেখানে ২০ মাইলের বেশি এলাকাজুড়ে একটি ‘মৃত্যুপুরী’ তৈরি হয়েছে। কিছু ড্রোন ৩০ মাইল পর্যন্ত তারের সংযোগ বজায় রাখতে পারে, যা হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ অংশের সমান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইউক্রেনীয় অভিজ্ঞতার কোনো প্রয়োজন নেই এবং তারা ড্রোন সম্পর্কে বেশি জানে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন মেরিন কোর সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এফপিভি ড্রোন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে, যা কেবল প্রাথমিক ধাপ।
ন্যাটোর সাবেক নীতি-পরিকল্পনা পরিচালক ফাব্রিস পতিয়ের বলেন, ‘ন্যাটোর শীর্ষ পর্যায়ে এখনো ঔদ্ধত্যের দেয়াল রয়েছে। কিন্তু ইউক্রেনে যা ঘটছে এবং ইরান যেভাবে বিমান হামলা মোকাবিলা করছে, তা একটি সতর্কবার্তা।’
ভবিষ্যতের যুদ্ধে এফপিভি ড্রোনের ভূমিকা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা সত্ত্বেও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ড্রোন হামলা বন্ধ করা যায়নি। ফাইবার অপটিক তারযুক্ত এফপিভি ড্রোন বর্তমান ইলেকট্রনিক প্রতিরোধব্যবস্থার মাধ্যমে থামানো সম্ভব নয়, যা একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো রব লি বলেন, ইউক্রেনে ড্রোন মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ড্রোন টিমগুলোকে শনাক্ত করে নির্মূল করা। তবে হরাইজন এনগেজের গবেষণাপ্রধান মাইকেল নাইটস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার অস্ত্র ও গোয়েন্দা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ড্রোন ক্রুদের দমন করা সম্ভব।
ইউক্রেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাভলো ক্লিমকিন সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তিগত বা মানসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় কোনো সশস্ত্র বাহিনীই এই চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত নয়।



