ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে আরব মিত্রদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দাবি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ প্রায় এক মাস অতিক্রম করলেও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব মিত্র দেশগুলো এখনও তড়িঘড়ি কোনো সমঝোতা বা দায়সারা শান্তি চুক্তিতে রাজি নয়। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুরুতে যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্কিত থাকলেও এখন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর লক্ষ্য হলো ইরানকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা। একটি তাড়াহুড়ো করা অস্থিতিশীল চুক্তির চেয়ে এই কঠোর পদক্ষেপই তাদের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
ইরানের কঠোর অবস্থান ও আরব দেশগুলোর উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক মাসের টানা হামলায় ইরান বিধ্বস্ত হলেও দেশটির সরকারের পতন ঘটেনি। বরং তেহরানের নেতৃত্ব আরও কঠোর ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত চায় যুদ্ধের একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি, তা কূটনৈতিক পথেই হোক বা সামরিক উপায়ে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ইরান যদি তার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ মানতে রাজি না হয়, তবে আলোচনার টেবিলে তাদের নতিস্বীকার করতে বাধ্য করার জন্য আরও জোরালো সামরিক অভিযানের পক্ষপাতি রিয়াদ ও আবুধাবি।
এক ইউরোপীয় কর্মকর্তার বক্তব্য অনুসারে, তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে এখনই যুদ্ধে তীব্রতা বাড়াতে বলছে না, তবে যুদ্ধ শেষে উপসাগরের ওপারে যাতে একজন ‘ভদ্র ও মার্জিত’ আলাপকারী পাওয়া যায়, সেই পরিবেশ তৈরির কথা বলছে। সহজ কথায়, আরব দেশগুলো এখন একটি ‘বিনয়ী ইরান’ দেখতে চায়। কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনও এই অবস্থানে সৌদি-আমিরাতের পাশে রয়েছে। একমাত্র ওমান ব্যতিক্রম হিসেবে এখনও যুদ্ধের বিরোধিতা করছে এবং আঞ্চলিক মঞ্চে তেহরানের পক্ষে ওকালতি করছে।
হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি
আরব দেশগুলোর উদ্বেগের মূল কারণ হলো হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নৌ-চলাচল বাধাগ্রস্ত করা এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা। গত এক মাসে ইরানের এই রণকৌশল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। আরব কর্মকর্তাদের ভয়, ইরানকে কোনো বড় মাশুল না দিয়ে যদি এখনই যুদ্ধবিরতি দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে তেহরান সামান্য স্বার্থেই আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সাহস পাবে।
এক আরব কর্মকর্তা স্পষ্টভাবে বলেন, ‘ইরান বিশ্বাস করছে যে তারাই জিতছে।’ তার মতে, এখনই যুদ্ধবিরতি হলে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলো আরও শক্তিশালী হবে। ইতোমধ্যে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ১০০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখনও যুদ্ধের মেজাজেই আছেন। পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্স-এ লিখেছেন, ‘আমাদের মাটি রক্ষার সংকল্প পরীক্ষা করতে আসবেন না।’
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
ইরানের ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর বিলাস বহুল হোটেল, বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যার পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি ডলার। কাতারের প্রধান প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্র রাস লাফান-এ হামলা দোহাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। কাতারের সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে নাওয়াফ বিন মুবারক আল থানি বলেন, এটি একটি বড় ধাক্কা ছিল এবং সম্পর্ক আর আগের জায়গায় ফিরে যাবে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুলখালেক আব্দুল্লা সরাসরি বলেছেন, ‘কাজটি শেষ করুন’। দুবাই পাবলিক পলিসি রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মোহাম্মদ বাহারুন এই যুদ্ধকে পচন ধরা ক্ষতের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আপনি গ্যাংগ্রিন নিরাময়ের সব চেষ্টা করবেন যাতে অঙ্গহানি না হয়। কিন্তু যদি পচন ছড়িয়ে পড়ে, তবে আপনাকে সেই অংশটি কেটে ফেলতেই হবে।’
কিংস কলেজ লন্ডনের বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন একটি ‘প্রতিরোধের ভারসাম্য’ তৈরি করতে চায়। তবে তাদের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইরান এই হামলা ভুলে যাবে না এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থাও টিকে থাকবে। আরব দেশগুলোকে তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সবসময় ইরানের প্রতিবেশী হয়েই থাকতে হবে। অনেক অর্থেই তারা ভূগোলের বন্দি।’



