লারকানা ষড়যন্ত্র: পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গোপন পরিকল্পনা
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একচেটিয়া বিজয় পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বকে হতভম্ব করে দেয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন, কিন্তু ফলাফল সামরিক বাহিনীর প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি জাতীয় আসনের মধ্যে ১৬০টিতেই জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ, যা সামরিক শাসনের অবসান ঘটাতে পারে বলে শঙ্কিত হয়ে পড়ে পাকিস্তানি জেনারেলরা।
গোয়েন্দা পূর্বাভাস ও সামরিক প্রতিক্রিয়া
বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল যে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, ফলে সামরিক বাহিনীর প্রাধান্য বহাল থাকবে। কিন্তু ১৪ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা সতর্ক করেছিলেন যে শেখ মুজিব অন্তত ৭৫ শতাংশ ভোট পাবেন। নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে মেজর জেনারেল গোলাম ওমরকে জিজ্ঞাসা করেন, "এসব কী হচ্ছে? কাইয়ুম খান, সবুর খান আর ভাসানীকে অর্থায়নের কী হলো?"
লারকানায় ভাগ্যনির্ধারণী সভা
১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সিন্ধু প্রদেশের লারকানায় জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাড়িতে এক গোপন সভায় মিলিত হন। এই সভায় উপস্থিত ছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল আবদুল হামিদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা, মেজর জেনারেল ওমর প্রমুখ। প্রচার করা হয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট পাখি শিকারে গেছেন, কিন্তু পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল মুহাম্মদ আসগার খান বলেছেন, "এখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে শেখ মুজিব যদি তাঁর মনোভাব পরিবর্তন না করেন, তবে পূর্ব পাকিস্তানে শক্তি প্রয়োগ করা হবে।"
স্কোয়াড্রন লিডার সামির বর্ণনায়, ইয়াহিয়া খান ভুট্টোকে দুইটি অপশন দেন: সংসদ আহ্বান করা অথবা শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো। ইয়াহিয়ার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে তিনি ভুট্টোর রাজনৈতিক সমর্থন পাবেন বলে আশ্বস্ত হয়েছেন।
অতি গোপনীয় চিঠি ও সামরিক প্রস্তুতি
লারকানা সভার পর জিএইচকিউ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের পাঁচটি স্টেশন সদর দপ্তরে একটি টপ সিক্রেট চিঠি পাঠানো হয়। চট্টগ্রামের স্টেশন অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদার এই চিঠি পেয়ে মর্মাহত হন। চিঠিতে উল্লেখ ছিল যে আওয়ামী লীগের ছয় দফা বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনা বিলুপ্ত হবে এবং হাজার হাজার পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক কর্মচারীর বাধ্যতামূলক অবসরে "প্রথম শ্রেণির আর্মি" "তৃতীয় শ্রেণির আর্মিতে" পরিণত হবে। উপসংহারে লেখা ছিল, "শেখ মুজিবকে কিছুতেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া যায় না।"
অপারেশন ব্লিৎস থেকে অপারেশন সার্চলাইট
নির্বাচনের আগেই লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুব খান "অপারেশন ব্লিৎস" নামে একটি সীমিত সামরিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় এই পরিকল্পনা অকার্যকর হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জিএইচকিউতে জেনারেল হামিদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা, লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান, মেজর জেনারেল আকবর প্রমুখের উপস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১৫ মার্চ লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে "অপারেশন সার্চলাইট" নামে একটি ব্যাপক সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করতে নির্দেশ দেন। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল:
- সব গুরুত্বপূর্ণ শহরে একই সময়ে আক্রমণ
- বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা
- বেতারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ
- আওয়ামী লীগের ১৬ জন শীর্ষ নেতার গ্রেপ্তার
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস তল্লাশি
- বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্রকরণ
চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন
২৪ মার্চ মেজর জেনারেল ফরমান আলী ও মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা বিভিন্ন সেনানিবাসে গিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের আদেশ মৌখিকভাবে পৌঁছে দেন। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। রাত ১০টায় তাঁর বিমান পাকিস্তানের সীমানায় পৌঁছালে অপারেশনের সময় রাত ১২টায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়। রাত ১১টা থেকে ট্যাঙ্ক ও সামরিক যানবাহন লক্ষ্যস্থলের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ভেবেছিল যে এই অভিযানের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন চিরতরে দমন করা যাবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে লারকানা ষড়যন্ত্র চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়। বছর না ঘুরতেই পাকিস্তান ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায় এবং জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।



