ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে আলোচনার ধোঁয়াশা: ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা ও প্রতিক্রিয়া
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে আলোচনার ধোঁয়াশা: ট্রাম্পের পরিকল্পনা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে আলোচনার ধোঁয়াশা: ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা ও প্রতিক্রিয়া

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে শুরু থেকেই ধোঁয়াশা ছিল। তবে চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি দাবি সেই ধোঁয়াশাকে আরও ঘনীভূত করেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ‘অভূতপূর্ব অগ্রগতি’ হচ্ছে। অন্যদিকে, ইরান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেকোনও আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কীসের আলোচনা? কার সঙ্গে এই আলোচনা? মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর নিশ্চিত করেছে।

ট্রাম্পের ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা

মঙ্গলবার গভীর রাতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে একটি ১৫ দফার শান্তি পরিকল্পনা পাঠিয়েছে। এটি মূলত যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে ইরান এখন পর্যন্ত যেকোনও ধরনের আলোচনার খবর অস্বীকার করেছে এবং ‘পূর্ণ বিজয়’ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।

নেপথ্যে কী ঘটছে?

পাকিস্তান, মিসর এবং পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো পর্দার আড়ালে আলোচনার একটি পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। তবে এসব প্রচেষ্টা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা ১৫ দফার পরিকল্পনা তেহরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
  • যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলার কথা বললেও এখন তিনি সেই অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছেন।
  • ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা চিরতরে বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

ইরানের কঠোর প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার খবরে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা কিছুটা অবাক হয়েছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনও ইরানের ধর্মতাত্ত্বিক শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যেই অটল রয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানের ওপর গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার পরও দেশটির নেতৃত্ব এখনও বেশ সংহত।

নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনিকে তার বাবার মৃত্যুর পর এখনও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, বর্তমান যুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে স্থানীয় কমান্ডারদের নির্দেশে বেশি হামলা চালানো হচ্ছে। গত মঙ্গলবার ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি আলিয়াবাদি হুঙ্কার দিয়েছেন, ‘পূর্ণ বিজয় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে’। এটিকে ট্রাম্পের আলোচনার দাবির বিরুদ্ধে একটি কঠোর পাল্টা জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কৌশলগত কালক্ষেপণ?

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই আলোচনার ঘোষণা হয়তো কেবলই সময় কেনার একটি কৌশল। গত সপ্তাহান্তে ট্রাম্প আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ না ছাড়ে তবে তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ‘গুড়িয়ে’ দেওয়া হবে। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি ডেডলাইন আরও পাঁচ দিন বাড়িয়ে দেন।

নিউ ইয়র্কভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সুফান সেন্টার তাদের বিশ্লেষণে বলেছে, ‘ট্রাম্প হয়তো সক্রিয়ভাবে এই যুদ্ধ থেকে বেরোনোর পথ খুঁজছেন।’ তবে অন্য একটি সম্ভাবনা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের পথে থাকা হাজার হাজার মার্কিন মেরিন সেনা ও ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের ১ হাজার সেনা পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত তিনি সময় নিচ্ছেন। এই সেনা মোতায়েন কি আলোচনার চাপ সৃষ্টি করতে, নাকি ইরানের তেলসমৃদ্ধ খার্গ দ্বীপ দখল বা ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার কোনও বড় অভিযানের প্রস্তুতি, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে।

আলোচনার মূল বাধা কোথায়?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আস্থার সংকট এখন চরমে। ২০১৮ সালে ট্রাম্প একতরফাভাবে পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই এই ফাটল শুরু হয়। ট্রাম্পের দাবি, যেকোনও চুক্তিতে ইরানকে অবশ্যই তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু ইরান বরাবরই শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে তাদের অধিকার বলে দাবি করে আসছে।

আব্বাস আরাঘচি আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘আমরা কেবল যুদ্ধবিরতিতে বিশ্বাস করি না। আমরা যুদ্ধের অবসান চাই... সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান।’

ইসরায়েলের ভূমিকা

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আলোচনার প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। নেতানিয়াহু ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিলেও জানিয়েছেন, আপাতত হামলা অব্যাহত থাকবে। এছাড়া ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থামলেও লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান থামার কোনও লক্ষণ নেই। এই জটিল পরিস্থিতিতে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।