ইরানের ড্রোন কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ আধিপত্য চ্যালেঞ্জ: বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের নিম্ন উচ্চতার ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। মঙ্গলবার ‘মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট’ আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, নিম্ন উচ্চতার হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের ঘাটতি ছিল, আর ইরান ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়ে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশল সফলভাবে গড়ে তুলেছে।
উচ্চ আকাশে সফলতা, নিম্ন আকাশে সংকট
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো কেলি গ্রিকো আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘এই যুদ্ধের একটি অদ্ভুত বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেই জায়গাগুলোতেই ভালো করছে, যেখানে তাদের ভালো করার কথা ছিল। অর্থাৎ উচ্চ আকাশসীমায় ইরানের সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রথাগত লড়াইয়ে তারা সফল হচ্ছে।’ তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, নিম্ন আকাশসীমার চ্যালেঞ্জে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে, কারণ সেখানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও গুরুত্বের অভাব রয়েছে।
গ্রিকো ব্যাখ্যা করেন, ইরান অত্যন্ত ভ্রাম্যমাণ বা হাইলি মোবাইল ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ আধিপত্য রুখে দিচ্ছে, যেখানে এই আধিপত্য বজায় রাখা ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করলেও, নিচু দিয়ে ওড়া ইরানি ড্রোন শনাক্ত করতে ভিন্ন ধরনের সেন্সর ও রাডারের প্রয়োজন, যা তাদের কাছে সীমিত।
ধ্বংসাত্মক বনাম বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যুদ্ধ
গ্রিকো আরও উল্লেখ করেন, ইরান এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করছে না, কারণ আকাশপথে আধিপত্য অর্জন তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যা করছে, সেটাকে আমি ‘ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ’ বলব। তারা মূলত লঞ্চার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত ধ্বংস করার ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরান একেবারেই ভিন্ন পথ নিয়েছে। তারা চালাচ্ছে একধরনের ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যুদ্ধ’ বা ওয়ার অব ডিসরাপশন। তারা নিচু আকাশসীমা ব্যবহার করে, বিশেষ করে ড্রোন দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর ব্যাপক ক্ষতি ও ভোগান্তি তৈরি করতে পারছে।’
ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোনগুলো নির্মাণে খরচ খুব কম হলেও এগুলো মোকাবিলায় লাখ লাখ ডলার খরচ করতে হচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এই ড্রোন আটকাতে যুদ্ধবিমান ও বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর বেশি নির্ভরশীল, যা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রতিরক্ষা মজুত সংকট ও সমাধানের পথ
যুদ্ধের দশম দিনে ট্রাম্প প্রশাসনকে জানানো হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিধ্বংসী ‘ইন্টারসেপ্টর’ এতটাই কমে এসেছে যে এখন তারা বেছে বেছে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। সাধারণত একটি ধেয়ে আসা ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে দুটি ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়, যা সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ায় সংকট তীব্র হচ্ছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের প্রতিরক্ষা ও কৌশল প্রোগ্রামের প্রধান মাইকেল ও’হ্যানলন বলেন, ‘প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অবশ্যই জরুরি। ৩০ বছর আগে এটি পরিষ্কার ছিল না, কিন্তু এখন হয়েছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ইরান একটি অস্ত্রের পেছনে যা খরচ করছে, যুক্তরাষ্ট্র তার ১০ গুণ খরচ করতে পারলেও ১০০ বা ১০০০ গুণ খরচ করা সম্ভব নয়, তাই ড্রোনের বিরুদ্ধে উচ্চমূল্যের ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার টেকসই নয়।
সমাধানের পথ হিসেবে ও’হ্যানলন লেজার অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানের জন্য, যদিও লেজার মেঘের ভেতর দিয়ে ভালো কাজ করে না বলে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি সতর্ক করেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, এবং বর্তমানে ব্যবহারের গতি উৎপাদনের চেয়ে বেশি।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কৌশল ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
কেলি গ্রিকো মনে করেন, ইরান এই যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করার কৌশল নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইরান বুঝতে পেরেছে এটি দীর্ঘ যুদ্ধ হতে পারে। যদি তারা এই লড়াইকে ব্যয়বহুল ও যন্ত্রণাদায়ক করতে চায়, তবে প্রতিদিন কত বড় হামলা হলো, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের আসল শক্তি হলো—দিনের পর দিন হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ও হুমকি হিসেবে টিকে থেকে খরচ বাড়িয়ে দেওয়া।’
অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের ভিন্ন মূল্যায়ন তুলে ধরে দাবি করেন, ইরানের আধুনিক সামরিক বাহিনীকে প্রথম দিন থেকেই এত দ্রুত পরাজিত হতে দেখা যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, নিম্ন আকাশসীমার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন, নতুবা ইরানের বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যুদ্ধ কৌশল আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।



