১৯৭১-এ পাকিস্তানি শাসকদের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ
১৯৭১-এ পাকিস্তানি শাসকদের বিচ্ছিন্নতা ও মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১-এ পাকিস্তানি শাসকদের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে, যখন পূর্ব পাকিস্তানে উত্তেজনা চরমে, তখন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক ও প্রশাসক চক্র সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল। ইকবাল আখুন্দ তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন, কায়রো দূতাবাস থেকে ছুটি নিয়ে করাচিতে যাওয়ার পর তিনি বেলগ্রেডে বদলির আদেশ পান। ঠিক সেই দিনই ইয়াহিয়া খান বাঙালিদের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।

কাওয়ালির আসরে উদাসীনতা

সেদিন সন্ধ্যায় ইয়ার দোস্তরা তাঁকে নিয়ে যায় একটি কাওয়ালির আসরে। সেখানে খান সমঝদাররা মেঝেতে মোটা বালিশে হেলান দিয়ে পান চিবোচ্ছিলেন আর গায়কদের দিকে ব্যাংকনোট বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটে চলছিল, সে ব্যাপারে কারও মুখে একটি শব্দও ছিল না। ঢাকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশার জন্য কোনো উদ্বেগ তাদের কণ্ঠে ঝরেনি।

এই দৃশ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি এস্টাবলিশমেন্টের একটি প্রতিচ্ছবি। যদিও কেউ কেউ বাঙালিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, কিন্তু অনেকেই ভেবেছিলেন যা ঘটার তা শেখ মুজিবের বেলায়ই ঘটেছে। সংকট ও অনিবার্য বিপর্যয় নিয়ে কারও চেহারায় কোনো ভাবান্তর দেখা যায়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভুট্টোর ভূমিকা ও বিভ্রান্তি

ঢাকা থেকে ফিরে জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা করেন, ‘এ যাত্রায় ফাঁড়া কেটে গেছে পাকিস্তানের!’ তবে পরদিন সকালে করাচিতে তাঁর সঙ্গে ফোনালাপে তাঁর কণ্ঠ কিছুটা হতোদ্যম শোনায়। ইয়াহিয়া খান কেন সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করলেন, তা জানতে চাইলে ভুট্টো বলেন, ‘এটা নিছক লোকদেখানো ব্যাপার। শিগগিরই আরও নতুন ঘটনা ঘটতে দেখবে তুমি।’

তিনি সম্ভবত বিশ্বাস করতেন যে সামরিক বাহিনী তাঁকে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে দেবে, কিন্তু দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে যায় যে এমন চিন্তা তাদের মাথায় নেই। তবুও ভুট্টো অবিচল থাকেন এবং কয়েক মাস পরেই তিনি ২৫ মার্চের ভয়াল রাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সেন্সরশিপ ও মিথ্যা প্রচারণা

২৫ মার্চের পর নভেম্বর পর্যন্ত সময়টি ছিল বিভ্রান্তি ও অন্ধকারের কাল। পাকিস্তানি সেন্সরশিপ এবং বিদেশি সংবাদদাতাদের বহিষ্কারের মাধ্যমে বাস্তবতাকে আড়াল করা হয়। পাকিস্তানি সংবাদপত্র এমন কাহিনি প্রচার করত যাতে মনে হতো সবকিছু স্বাভাবিক। অন্যদিকে, ভারতীয় প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে বাইরের বিশ্ব পরিস্থিতির খবর পেত।

যত দিন যেতে থাকে, বাঙালিরা ভারতে আশ্রয় নিতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে থাকে। পাকিস্তানি নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্রগুলোও পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তথাকথিত ‘দুর্বৃত্ত’দের সংঘর্ষের কথা উল্লেখ করতে বাধ্য হয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও পাকিস্তানের ভাবমূর্তি

প্রকৃত সত্য প্রকাশিত হতে শুরু করায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়। মানবাধিকার সংগঠন, পরিবেশবাদী গোষ্ঠী, রক ব্যান্ড যেমন বিটলস, এবং হলিউড তারকারা বাংলাদেশের সংগ্রামের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানে এটিকে ‘হিন্দু-ইহুদি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখা হয়।

জেনেভায় পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতদের একটি বৈঠকে তাদের ভাবমূর্তি খারাপ হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়। রাষ্ট্রদূতরা দাবি করেন যে পূর্ব পাকিস্তানের বাস্তবতা প্রকাশ করা হোক। কিন্তু ইসলামাবাদ আত্মপ্রবঞ্চনায় এতটাই বিভোর ছিল যে তারা বিশ্বাস করত বিশ্ব সম্প্রদায় তাদের সমর্থন করছে।

যুদ্ধের দিকে অগ্রসর ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা

যুদ্ধ ঘনিয়ে এলে অনেকেই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেন। দিল্লিতে লন্ডন টাইমসের প্রতিনিধি পিটার হ্যাজেলহার্স্ট প্রতিবেদন পাঠান যে ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার চিন্তা করছে। জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্টও তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

মার্শাল টিটো নয়াদিল্লি সফরে গিয়ে পাকিস্তান সরকারকে শান্তির বার্তা দিতে চান, কিন্তু তিনি ভারতকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত দেখেন। টিটো পাকিস্তানকে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে মীমাংসার তাগিদ দেন, যা ভারতের অবস্থানের পক্ষেই যায়।

পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ ও ভুট্টোর প্রতিক্রিয়া

ডিসেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে, ভুট্টো নিরাপত্তা পরিষদে একটি আবেগী বক্তৃতা দেন এবং ‘শিকেয় তুলে রাখো তোমার নিরাপত্তা পরিষদ’ বলে চেম্বার ছেড়ে চলে যান। আগা শাহি পরে দাবি করেন যে ভুট্টো এই দৃশ্যের মহড়া দিয়েছিলেন।

উপসংহার: একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা

১৯৭১ সালের ঘটনাবলি পাকিস্তানি শাসকচক্রের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে। ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে সামরিক অভিযান মারাত্মক ভুল প্রমাণিত হয়, যা বাংলাদেশের জন্মের পথ প্রশস্ত করে। এই ইতিহাস আমাদের শেখায় যে সংকটকালে রাজনৈতিক মীমাংসাই টেকসই সমাধানের একমাত্র পথ।