ইসরায়েলের অস্ত্রের উৎস: একটি গভীর বিশ্লেষণ
বর্তমানে ইসরায়েল একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, যার মধ্যে গাজা উপত্যকা, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা অন্তর্ভুক্ত। এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের অস্ত্রের উৎস ও সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রতিবেদনে ইসরায়েলের অস্ত্রশিল্প, রপ্তানি, আমদানি এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
নিজস্ব অস্ত্রশিল্পের বিকাশ
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অস্ত্রশিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় তারা দ্রুত আধুনিক অস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে ইসরায়েল আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক, রাডার, স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত ডিসেম্বরে ঘোষণা দেন যে, ইসরায়েল আগামী ১০ বছরে ১১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে স্বাধীন অস্ত্রশিল্প গড়ে তুলবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশটি অস্ত্রখাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী অস্ত্র রপ্তানি
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল এখন বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। ২০২১-২০২৫ সময়কালে তাদের অস্ত্র রপ্তানি ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক অস্ত্র রপ্তানির ৪.৪ শতাংশ অংশের সমান।
ইসরায়েলের রপ্তানি করা অস্ত্রের মধ্যে আয়রন ডোম, ডেভিড’স স্লিং, অ্যারোর মতো অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য। ২০২১-২০২৫ সালে ইসরায়েল ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মোট ৪৭টি দেশে অস্ত্র রপ্তানি করেছে। ক্রেতা দেশগুলোর মধ্যে ভারত, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া ও মরক্কো অন্তর্ভুক্ত।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ২০২৪ সালে তাদের অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ রেকর্ড ১,৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৫ সালেও এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।
অস্ত্র আমদানির বিশাল পরিমাণ
রপ্তানির পাশাপাশি ইসরায়েল অস্ত্র আমদানিও বাড়িয়েছে। ২০২১-২০২৫ সময়কালে বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানিতে ইসরায়েলের অংশভাগ ১.৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের পাঁচ বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই সময়ে ইসরায়েল বিশ্বের ১৪তম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী, যা তাদের মোট আমদানির ৬৮ শতাংশ জোগান দেয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫৫টি যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আদেশ দেয়, যার মধ্যে ৩০টি এফ-৩৫ এবং ২৫টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত। ২০২৬ সালে এই বিমান সরবরাহের কথা রয়েছে।
জার্মানি ইসরায়েলের অস্ত্র আমদানির দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস, যা মোট আমদানির ৩১ শতাংশ সরবরাহ করে, প্রধানত ফ্রিগেট ও টর্পেডো। ইতালি তৃতীয় বৃহত্তম উৎস, যা ১.৩ শতাংশ অস্ত্র সরবরাহ করে। অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন, রোমানিয়া, কানাডা ও ভারত উল্লেখযোগ্য।
গাজা যুদ্ধের প্রভাব ও নিষেধাজ্ঞা
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর, বিভিন্ন দেশ ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। জার্মানি ২০২৫ সালের আগস্টে ঘোষণা দেয় যে, গাজায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি বন্ধ থাকবে। ইতালি ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নতুন অস্ত্র রপ্তানি স্থগিত করেছে, তবে পুরোনো চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।
যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেন, বেলজিয়াম, স্লোভেনিয়াসহ অন্যান্য দেশও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। দ্য হেগ গ্রুপ নামক ১২টি দেশের জোট ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইসরায়েলের কাছে সব ধরনের অস্ত্র বিক্রি বন্ধের অঙ্গীকার করে, পরবর্তীতে তুরস্কও একই ঘোষণা দেয়।
তবে এই নিষেধাজ্ঞাগুলোর প্রভাব সীমিত, কারণ যুক্তরাষ্ট্র তাদের অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। অনেক দেশ পুরোনো চুক্তি বহাল রেখেছে এবং ইসরায়েল নিজেই যুদ্ধকালে অস্ত্র উৎপাদন দ্রুত বাড়িয়ে চলছে।
উপসংহার
ইসরায়েলের অস্ত্রের উৎস একটি জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা নিজস্ব শিল্প, ব্যাপক রপ্তানি এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানির সমন্বয়ে গঠিত। গাজা যুদ্ধের পর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও, ইসরায়েলের অস্ত্র সরবরাহ মূলত অব্যাহত রয়েছে, যা আঞ্চলিক সংঘাতের গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করছে।



