ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা: পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও সম্ভাব্য ভেন্যু নিয়ে জল্পনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার (২৩ মার্চ) ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার ঘোষণা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক বা সংলাপের কথা স্বীকার করা হয়নি, তবুও গোপনে এই সংঘাত নিরসনে তুরস্ক, রাশিয়া ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ চেষ্টা চালাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কোথায় হতে পারে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা বা বৈঠক।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া পাকিস্তান এখন ইরান এবং তার শত্রু রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে শান্তি স্থাপনে প্রধান মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছে। ইসলামাবাদ তাদের সেনাপ্রধানের সঙ্গে তেহরানের সুসম্পর্ক এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে এই প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তান চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে ইসলামাবাদের নাম প্রস্তাব করেছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির রোববার (২২ মার্চ) মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ সোমবার (২৩ মার্চ) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে তেহরানের সঙ্গে ‘অত্যন্ত ভালো এবং ফলপ্রসূ’ আলোচনার পর তিনি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার হুমকি স্থগিত করেছেন। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে কিছু বন্ধুরাষ্ট্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ সম্বলিত বার্তা পাওয়া গেছে, তবে ইরানের মৌলিক অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এম.বি. গালিবাফও বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি এবং ‘ফেক নিউজ’ ব্যবহার করে আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যান্য দেশের ভূমিকা ও সম্ভাবনা
পাকিস্তানের পাশাপাশি তুরস্কও যুদ্ধের আগে থেকেই মধ্যস্থতার চেষ্টায় জড়িত রয়েছে। একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা না হলেও মিশর, পাকিস্তান এবং উপসাগরীয় দেশগুলো বার্তা আদান-প্রদান করছে।
হোয়াইট হাউস শান্তি প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, এগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে কোনো আলোচনা করবে না।
যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ও বিশ্লেষণ
যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করায় বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা যেকোনো মধ্যস্থতার সাফল্যের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। চ্যাথাম হাউস থিংক ট্যাঙ্কের সানাম ভাকিল বলেন, বেশ কিছু দেশ সংঘাত প্রশমনে ‘আপ্রাণ চেষ্টা’ করছে, তবে তিনি একে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সংকেত হিসেবে দেখছেন না।
ভাকিল আরও যোগ করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপের কারণে ট্রাম্প তার হুমকি থেকে পিছিয়ে আসতে পারেন, কারণ ইরান হুমকি দিয়েছে যে তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা হলে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হবে। উভয় পক্ষই সমঝোতার রূপরেখা নিয়ে ভাবছে, তবে কারো মধ্যেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাধারণত ওমান এবং কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করে থাকে, কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে ওমানে আলোচনা চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি হামলার পর মাস্কাটকে আর সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। জেনেভায় ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরানি কর্মকর্তাদের আলোচনার দুই দিন পর যুদ্ধ শুরু হওয়ায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বড় কোনো গতি আসেনি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।



