ইরানের হুমকিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের পানি শোধনাগার: যুদ্ধের নতুন লক্ষ্যবস্তু
ইরানের হুমকিতে উপসাগরীয় পানি শোধনাগার: যুদ্ধের নতুন লক্ষ্য

ইরানের হুমকিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের পানি শোধনাগার: যুদ্ধের নতুন লক্ষ্যবস্তু

ঐতিহাসিকভাবে যুদ্ধে প্রতিপক্ষের সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও বর্তমান বিশ্ব সংঘাতে পরিবর্তন এসেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর এবার ইরান যুদ্ধে পানি শোধনাগার হামলার নতুন টার্গেট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইরান ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোর পানি শোধনাগারে হামলার হুমকি দিয়েছে, দাবি করছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে তাদের নিজস্ব পানি ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের হুমকি ও হরমুজ প্রণালি সংকট

গত রবিবার ইরানের সামরিক বাহিনী অঞ্চলটির অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানোর হুমকি দেন। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানান, "আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তেহরান যদি হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাবে।"

ইরানের সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, সতর্ক করার পরও শত্রুপক্ষ যদি ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কিত সব জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও পানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং তা পুনরায় খোলা হবে না যতক্ষণ না ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইরানের এই হুমকির কারণে সবশেষ তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়, যার ফলে ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে ভয়াবহতম জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পূর্ববর্তী হামলা ও অভিযোগ

বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, গত ৮ মার্চ ইরানি একটি ড্রোন তাদের একটি পানি শোধনাগারে আঘাত হেনেছে, যাতে পানি অবকাঠামোটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাহরাইনের অভিযোগ, তেহরান ইচ্ছে করেই বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। অবশ্য, হামলার পর বাহরাইনের ন্যাশনাল কমিনিউকেশন দফতর থেকে বলা হয়, ইরানি হামলায় পানি সরবরাহ বা নেটওয়ার্ক ক্যাপাসিটিতে কোনও প্রভাব পড়েনি।

বাহরাইনে হামলার একদিন আগে অর্থাৎ ৭ মার্চ কেশম দ্বীপে অবস্থিত একটি পানি শোধনাগারে হামলা হয়, যেখান থেকে ইরানের ৩০টি গ্রামে পানি সরবরাহ করা হত। ইরান এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে এবং রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে, বাহরাইনের একটি ঘাঁটি থেকে কেশম দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের জ্বালানি মন্ত্রী আব্বাস আলিয়াবাদি রবিবার বলেন, "হামলাগুলো ডজনখানেক পানি পরিবহন ও পরিশোধন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কের কিছু অংশ ধ্বংস করেছে।"

পানির কৌশলগত গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

উপসাগরীয় দেশগুলোতে সুপেয় পানির চরম অভাব রয়েছে, যেখানে আরব দেশগুলোর পানীয় জলের বেশিরভাগই সমুদ্র থেকে সংগৃহীত হয়ে পানি পরিশোধন করে সরবরাহ করা হয়। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য মতে, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চলগুলোর একটি, যেখানে পানির প্রাপ্যতা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ কম। এ কারণে ওই অঞ্চলের অর্থনীতি ও পানীয় জলের সরবরাহের জন্য লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নেচার জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণার মতে, বিশ্বের মোট লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধিকরণ সক্ষমতার প্রায় ৪২ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত। ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন’র ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতে সুপেয় পানির ৪২ শতাংশ লবণাক্ত পানি থেকে আসে, সৌদি আরবে ৭০ শতাংশ, ওমানে ৮৬ শতাংশ এবং কুয়েতে ৯০ শতাংশ পানি বিশুদ্ধিকরণ প্ল্যান্ট থেকে সরবরাহ করা হয়।

পানি অর্থনীতিবিদ এসথার ক্রাউজার-ডেলবুর্গ গত মার্চে সতর্ক করে বলেছিলেন, "যুদ্ধরত পক্ষগুলো যদি পানি সরবরাহকে লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে এটি আজকের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ একটি যুদ্ধের সূচনা ঘটাতে পারে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, "অঞ্চলটিতে লবণাক্ত পানি ছাড়া কিছুই নেই, এবং দুবাই ও রিয়াদের মতো বড় শহরগুলোর জন্য সুপেয় পানি সরবরাহ বিশেষভাবে কৌশলগত।"

হামলার নজির ও সম্ভাব্য প্রভাব

গত দশকে লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রগুলোর ওপর কয়েকটি হামলা হয়েছে, যার মধ্যে ইরান সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের একটি প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছিল। প্যাসিফিক ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা অতীতে সৌদি আরবের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, আর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট পাল্টা হিসেবে ইয়েমেনের পানি অবকাঠামোর ওপর হামলা চালিয়েছে।

হামলা বাড়লে এর প্রভাব স্বল্পমেয়াদী বিঘ্ন থেকে শুরু করে অনেক বেশি গুরুতর পরিণতি পর্যন্ত হতে পারে। ক্রাউজার-ডেলবুর্গ বলেন, "প্ল্যান্টে হামলা হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে বড় শহরগুলোতে, এবং পানির ঘাটতি অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে পর্যটন, শিল্প এবং ডেটা সেন্টারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।"

ফরাসি প্রতিষ্ঠান ভিয়োলিয়ার আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের পরিচালক ফিলিপ বুরদো বলেছেন, "সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অবশ্যই আমাদেরকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে। কিছু দেশে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ বৃহত্তম প্ল্যান্টগুলোর চারপাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।" তিনি আরও যোগ করেন, বেশিরভাগ প্ল্যান্টে দুই থেকে সাত দিনের পানি ব্যবহারের সমপরিমাণ মজুত থাকে, যা সরবরাহ বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী না হলে ঘাটতি প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট হতে পারে।