বাহরাইনে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণ: গবেষণায় নতুন তথ্য প্রকাশ
বাহরাইনের রিফফা এলাকায় ৯ মার্চ সংঘটিত একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি ক্ষেপণাস্ত্র জড়িত থাকতে পারে বলে নতুন একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনায় কয়েক ডজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন এবং বহু ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোররাতে ছোড়া প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র থেকেই এই বিস্ফোরণ ঘটেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিস্ফোরণের পটভূমি ও আহতের সংখ্যা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর দশম দিনে বাহরাইনের রাজধানী মানামার উপকূলীয় সিতরা দ্বীপের মাহাজ্জা এলাকায় এই বিস্ফোরণ ঘটে। বাহরাইন সরকারের তথ্য অনুসারে, এই হামলায় শিশুসহ কমপক্ষে ৩২ জন আহত হন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিস্ফোরণের পর বাহরাইন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ইরানের ড্রোন হামলাকে দায়ী করে আসছিল।
তবে শনিবার বাহরাইন সরকার প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে যে, এই বিস্ফোরণে একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত ছিল। সরকারি মুখপাত্র জানান, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রটি মাঝ আকাশে একটি ইরানি ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করেছে, যা বহু প্রাণ রক্ষা করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি এবং আহত হওয়ার ঘটনা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর বা ইরানি ড্রোনের সরাসরি মাটিতে আছড়ে পড়ার কারণে ঘটেনি।’
গবেষণার মূল সিদ্ধান্ত
ক্যালিফোর্নিয়ার মিডলবারি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেইর, মাইকেল ডুইটসম্যান ও অধ্যাপক জেফরি লুইসের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সন্দেহভাজন ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্ভবত মাহাজ্জা এলাকা থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি থেকে ছোড়া হয়েছিল। গবেষকরা তাদের সিদ্ধান্তে ‘মধ্যম থেকে উচ্চ’ মাত্রার আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন।
তাদের এই গবেষণা ইন্টারনেটে প্রাপ্ত দৃশ্য এবং বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি পর্যালোচনার ভিত্তিতে করা হয়েছে। রয়টার্স এই বিশ্লেষণ নিশানা নির্ধারণ-বিষয়ক দুজন বিশেষজ্ঞ এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা বিষয়ক একজন গবেষককে দেখিয়েছে, যারা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার মতো কোনো কারণ খুঁজে পাননি।
ক্ষেপণাস্ত্রের উৎসস্থল শনাক্ত
গবেষকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর ভৌগোলিক অবস্থান বাহরাইনের রিফফা এলাকায় শনাক্ত করেছেন, যা রয়টার্সও নিশ্চিত করেছে। ভিডিওটি ৯ মার্চ স্থানীয় সময় রাত দুইটার দিকে অনলাইনে প্রথম পোস্ট করা হয়। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘রিফফা এলাকার অবস্থান ও অভিমুখ সন্দেহভাজন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।’
পরবর্তীতে গবেষকরা মাহাজ্জা এলাকার ‘ব্লক ৬০২’-এ আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রটির গতিপথ অনুসরণ করে এর উৎসস্থল খুঁজে বের করেন। বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্রের ভিত্তিতে তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, উৎসস্থলটি ছিল রিফফায় অবস্থিত একটি মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি, যা ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়নের ভিডিও ধারণ করার স্থান থেকে আধা মাইলের কম দূরে অবস্থিত।
মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যাটারির ভূমিকা
গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে, রিফফার ওই স্থানে ২০০৯ সাল থেকে একটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি ছিল, যা মার্কিন বাহিনী ব্যবহার করে থাকে। অন্যদিকে, লকহিড মার্টিনের তথ্য অনুসারে, বাহরাইন প্রতিরক্ষা বাহিনী ২০২৪ সালের আগে তাদের নিজস্ব প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার শুরু করেনি। গবেষকরা উল্লেখ করেন, রিফফার স্থাপনায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যাটারিগুলোর সঙ্গে হুবহু মিলে যায় এবং বাহরাইনের নিজস্ব ব্যাটারি থেকে আলাদা।
প্রতিরক্ষা এবং সামরিক শিল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ঘটনা বিরল, তবে একেবারেই অসম্ভব নয়। ২০০৭ সালে একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কাতারের একটি প্রতিষ্ঠানে আঘাত হেনেছিল বলে জানা যায়। সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনা বাড়াতে, কিন্তু এই ঘটনায় প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটির ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা নিশ্চিত করা যায়নি।
বিস্ফোরণের প্রভাব ও অনিশ্চয়তা
এই বিস্ফোরণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। যদিও বাহরাইন সরকার দাবি করেছে যে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে, কিন্তু মাহাজ্জার ঘটনায় কোনো ইরানি ড্রোনের ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে বাহরাইন বা যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। গবেষকরা দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটির নিচু গতিপথ এবং আগের উৎক্ষেপণের পথ থেকে বিচ্যুতিকে কোনো সম্ভাব্য সমস্যার লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তবে কোনো লক্ষ্যবস্তু নিশানা করে এটি ছোড়া হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও তারা উড়িয়ে দেননি।
মোটকথা, বাহরাইনের এই বিস্ফোরণ ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বৃদ্ধির একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। গবেষণার এই ফলাফল ঘটনার গভীরতা বুঝতে সহায়তা করছে, কিন্তু চূড়ান্ত সত্যতা নিশ্চিত করতে আরও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।



