ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ: সত্যের বলি, অর্থনৈতিক সংকট ও গণতন্ত্রের হুমকি
ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ: সত্য বলি ও অর্থনৈতিক সংকট

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ: সত্যের বলি ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব

প্রাচীন গ্রিক নাট্যকার এসকাইলাসের বিখ্যাত উক্তি ‘যুদ্ধে সত্যই হয় প্রথম বলি’ আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চরমভাবে বাস্তব হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধের ন্যায্যতা নিয়ে খোদ আমেরিকাতেই তীব্র প্রশ্ন উঠছে, যেখানে প্রোপাগান্ডা, অস্পষ্টতা ও বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

যুদ্ধের সূচনা ও প্রশাসনের অসঙ্গতি

২৮ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত আড়াইটায়, মার-এ-লাগো থেকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানে বোমা হামলার নির্দেশ দেন। তিনি দাবি করেন, ‘ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি থেকে আমেরিকানদের রক্ষা করতেই এই পদক্ষেপ’। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘ধূলিসাৎ’ করার দাবি করেছিলেন।

ট্রাম্প যখন যুদ্ধের ঘোষণা দিচ্ছিলেন, তখন তিনি হোয়াইট হাউসে না ফিরে নিজের কান্ট্রি ক্লাবে তহবিল সংগ্রহের নৈশভোজে ব্যস্ত ছিলেন। তার যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং এক্সে পোস্ট দিয়েছিলেন, ‘আতঙ্কিত হবেন না, ট্রাম্পের ওপর ভরসা রাখুন’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সত্যের অপলাপ ও বেসামরিক প্রাণহানি

যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, তারা ইরানি নেতৃত্বকে ‘শিরশ্ছেদ’ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন: প্রথম দিনের বোমা হামলায় দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে ১৭৫ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই স্কুলের শিশু। একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্রুজ মিসাইল হামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প ইরানকেই দোষারোপ করেন।

যুদ্ধের কারণ নিয়েও প্রশাসন থেকে আসছে পরস্পরবিরোধী তথ্য:

  • কখনও বলা হচ্ছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আমেরিকায় পৌঁছানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা সত্য নয়।
  • কখনও বলা হচ্ছে তারা পারমাণবিক বোমা বানানোর খুব কাছে, এটিও সত্য নয়।

এমনকি এটি ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’-এর যুদ্ধ কি না, তা নিয়েও ট্রাম্প দিনে কয়েকবার মত বদলাচ্ছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনৈতিক মহাপ্রলয়ের আশঙ্কা

এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ইরান লোহিত সাগরের বিকল্প পথগুলো বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। ইতোমধ্যে কাতারের রাস লাফান গ্যাস কেন্দ্রে হামলায় এলএনজি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ইউরোপে গ্যাসের দাম ৩৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগতে পারে।

আমেরিকায় জ্বালানি তেলের দাম প্রতি গ্যালন ২.৯০ ডলার থেকে বেড়ে ৩.৯০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প এখন দাবি করছেন, ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না। যদিও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন ট্রাম্পের সবুজ সংকেত নিয়েই তারা ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছে।

বীরত্ব না কি সহিংসতা?

সাবেক মেরিন সেনা ও লেখক ফিল ক্লে বলেন, ‘ইরাক যুদ্ধ ভুল ছিল, কিন্তু কেন সেখানে গিয়েছিলাম তা জানতাম। এই যুদ্ধে আমেরিকান সেনারা কেন লড়ছে, তা কেউ জানে না’। হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের কর্মকর্তাদের ‘বোলিং পিন’ হিসেবে দেখিয়ে মার্কিন বিমান দিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই ধরনের ‘ভিডিও গেম’ সদৃশ প্রচারণা যুদ্ধের ভয়াবহতাকে কেবল বিনোদনে পরিণত করেছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগনের প্রেস রুমে সাংবাদিকদের বদলে ‘ইনফ্লুয়েন্সার’দের জায়গা করে দিয়েছেন। সিএনএন-এর মতো সংবাদমাধ্যমকে ‘ফেক নিউজ’ আখ্যা দিয়ে সাংবাদিকদের ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে বিচারের হুমকি দিচ্ছেন ট্রাম্প ও তার অনুসারীরা।

গণতন্ত্রের হুমকি

ইতিহাসবিদ গ্যারি উইলস বলেছিলেন, ‘একটি উদার গণতন্ত্রের দেশ সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের চেয়েও দ্রুত প্রোপাগান্ডার কাছে নতি স্বীকার করে। আমলাতান্ত্রিক সেন্সরশিপের চেয়ে আত্ম-সেন্সরশিপ সবসময়ই বেশি কার্যকর’। ট্রাম্প যখন একদিকে ইরানি জনগণকে স্বাধীনতার ভাষা শেখাচ্ছেন, অন্যদিকে নিজের দেশে মুক্ত গণমাধ্যমের গলা টিপে ধরছেন, তখন সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে বলে গণতন্ত্রের সবচেয়ে পুরনো প্রতিশ্রুতিই আজ হুমকির মুখে।