তুরস্ক, সৌদি আরব, মিশর ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন সামরিক জোট গঠনের উদ্যোগ
তুরস্ক, সৌদি, মিশর, পাকিস্তানের সামরিক জোট গঠন

তুরস্ক, সৌদি আরব, মিশর ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন সামরিক জোট গঠনের উদ্যোগ

তুরস্ক, সৌদি আরব, মিশর ও পাকিস্তান একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট গঠনের জন্য ঐতিহাসিক আলোচনা শুরু করেছে। এই চারটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) রিয়াদে ইসলামি দেশগুলোর একটি সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠক করেছেন এবং প্রথমবারের মতো নিজেদের শক্তিকে একত্রিত করার উপায় নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করেছেন।

নিরাপত্তা চুক্তির প্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্য

তুরস্ক গত বছর থেকেই পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তির চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। চলতি বছরের শুরুর দিকে এক পাকিস্তানি মন্ত্রী এক বিবৃতিতে জানান যে, এ ধরনের একটি চুক্তি প্রায় এক বছর ধরে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তুর্কি সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, আঙ্কারা এই ব্যবস্থায় মিশরকেও অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে।

সূত্রগুলো স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এই চুক্তি ন্যাটোর গ্যারান্টি বা প্রতিশ্রুতিগুলোর মতো হবে না। বরং এটি একটি নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে, যা প্রতিরক্ষা শিল্প এবং বৃহত্তর প্রতিরক্ষা বিষয়ে আরও বেশি সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক সমস্যাগুলো সমাধানে যৌথ শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান শনিবার (২১ মার্চ) বলেন, ‘আঞ্চলিকভাবে নির্দিষ্ট মাত্রার প্রভাব রয়েছে এমন দেশ হিসেবে আমরা কীভাবে আমাদের শক্তিকে একত্রিত করে সমস্যার সমাধান করতে পারি, তা খতিয়ে দেখছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘সর্বোপরি, আমরা বেশ কিছুকাল ধরে বলছি যে অঞ্চলের দেশগুলোর একত্রিত হওয়া উচিত, আলোচনা করা উচিত এবং নতুন ধারণা তৈরি করা উচিত। আমরা 'আঞ্চলিক মালিকানা'র ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফিদান উল্লেখ করেন যে, দেশগুলো বর্তমানে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছে, যার মধ্যে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর তেহরানের পাল্টা হামলার বিষয়গুলোও রয়েছে। এই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের যৌথ প্রচেষ্টা কী ধরনের সুবিধা বয়ে আনতে পারে, তা-ও তারা বিবেচনা করছেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘নীতিগতভাবে আমাদের এটি স্বীকার করতে হবে: হয় আমাদের একত্রিত হয়ে নিজেদের সমস্যা নিজেদের সমাধান করতে শিখতে হবে, অথবা কোনো বহিরাগত আধিপত্যবাদী শক্তি এসে তাদের নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধি হয় এমন সমাধান আমাদের ওপর চাপিয়ে দেবে, অথবা নিজেরা কিছু না করে অন্যদেরও পদক্ষেপে বাধা দেবে।’

যৌথ বিবৃতি ও আঞ্চলিক ইস্যু

আঙ্কারা বারবার ইসরাইলকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রধান উস্কানিদাতা হিসেবে বর্ণনা করলেও, বৃহস্পতিবার রিয়াদে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর একটি যৌথ বিবৃতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেহরানের হামলার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। বিবৃতিতে ইসরাইলের কথা অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং লেবাননে তাদের ‘সম্প্রসারণবাদী’ নীতির কথা বলা হয়েছে।

ফিদান জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের একে অপরকে বিশ্বাস করতে শিখতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের একটি অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করতে সক্ষম হতে হবে।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক ও সম্মিলিত উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আঙ্কারার ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মিশরের মতো দেশগুলোর সবারই উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে এবং তারা গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ভূমিকা পালন করছে।

দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা

এই জোট গঠনের পেছনে দেশগুলোর শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা একটি বড় ভূমিকা পালন করছে:

  • তুরস্ক: আঙ্কারা তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে এবং উন্নত ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও জেটের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
  • পাকিস্তান: দেশটির কাছে পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ রয়েছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
  • সৌদি আরব: উন্নত প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে।
  • মিশর: সবচেয়ে জনবহুল আরব দেশ হিসেবে মিশর তার সামরিক সক্ষমতার কারণে এই অঞ্চলের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়।

দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ও চুক্তি

তুরস্ক ও মিশর ইতিমধ্যেই নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা গভীর করতে অগ্রগতি অর্জন করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের কায়রো সফরের সময় গত ফেব্রুয়ারিতে একটি দ্বিপাক্ষিক সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

ওই সফরের সময় তুর্কি অস্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘মেকানিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন’ (এমকেই) মিশরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি রপ্তানি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির মধ্যে গোলাবারুদ বিক্রি এবং উৎপাদন লাইন স্থাপনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এই নতুন সামরিক জোট গঠনের উদ্যোগ আঞ্চলিক শক্তি গঠনে একটি মাইলফলক হতে পারে, যা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্বিন্যাস করতে সাহায্য করবে।