ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে মার্কিন হামলা ৭,৮০০ ছাড়িয়েছে, বিশ্লেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন 'নতুন মধ্যপ্রাচ্য' অলীক হতে পারে
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে মার্কিন হামলা ৭,৮০০ ছাড়িয়েছে, বিশ্লেষকরা সতর্ক

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে মার্কিন হামলার সংখ্যা ৭,৮০০ ছাড়িয়েছে, বিশ্লেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন 'নতুন মধ্যপ্রাচ্য' অলীক হতে পারে

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী কয়েক দিন অন্তর অন্তর তাদের হামলার সাফল্যের খতিয়ান দিচ্ছে। বুধবার পর্যন্ত এই হামলার সংখ্যা ৭ হাজার ৮০০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে যুদ্ধের প্রথম দিনেই ছিল ১ হাজারটির বেশি লক্ষ্যবস্তু। অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার সংখ্যা গত সপ্তাহের শেষ নাগাদ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬০০-তে।

এক ঐতিহাসিক বোমাবর্ষণ অভিযান

পরিসংখ্যানের বিচারে এটি একটি ঐতিহাসিক বোমাবর্ষণ অভিযান। মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বারবার একে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর ওপর এক ‘চরম আঘাত’ হিসেবে প্রশংসা করছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আধুনিক ও সক্ষম একটি সামরিক বাহিনীকে এত দ্রুত ধ্বংস করে অকার্যকর করে দেওয়ার নজির আগে কখনও ছিল না।”

এত বিশাল আয়োজন সত্ত্বেও ইরান সামরিকভাবে পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যায়নি। দেশটি এখনও অপ্রথাগত উপায়ে পাল্টা আঘাত করে যাচ্ছে। তাদের এই প্রতিরোধ এবং নতুন নেতাদের রাজনৈতিক অবাধ্যতা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন হস্তক্ষেপের সেই কয়েক দশকের পুরনো ব্যর্থ প্রত্যাশার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্ববাজারে প্রভাব ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি

ইরানি হামলায় সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি রফতানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ক্রমেই বাড়ছে। প্রায় প্রতি রাতে ইরান থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোতে আঘাত হানছে। যদিও অধিকাংশ হামলায় ক্ষয়ক্ষতি কম, তবুও এই লড়াইয়ে ইরান, লেবানন ও ইসরায়েল মিলিয়ে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এছাড়া লেবানন ও ইরাকের ইরানপন্থি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো উত্তর ইসরায়েল এবং বাগদাদে বিশাল মার্কিন দূতাবাস চত্বরে রকেট হামলা চালিয়েছে।

ইরানের ওপর অভাবনীয় শক্তি প্রয়োগ এবং একের পর এক শীর্ষ নেতাকে হত্যার পরও দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। বিশ্লেষকরা এখন খতিয়ে দেখছেন, এই সংঘাত থেকে একটি ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ উদয়ের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তা গাজা, লেবানন বা ইরাকের আগের যুদ্ধগুলোর মতোই অলীক প্রমাণিত হবে কি না।

বিশ্লেষকদের সতর্কতা ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-এর অধ্যাপক ক্যাটলিন তালমাজ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রবণতা হলো অত্যধিক সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে রাজনৈতিক ফলাফল অর্জনের বিষয়টিকে বাড়িয়ে দেখা, আর এর নেতিবাচক প্রভাবকে কমিয়ে দেখা। আকাশপথে হামলা আমেরিকার কাছে নেশার মতো, আমরা বিশ্বাস করতে ভালোবাসি যে এটি বড় ধরণের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব ফেলবে, কিন্তু ইতিহাস তা সমর্থন করে না।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন যে ইরানের বিমান বাহিনী বিলুপ্ত এবং নৌবাহিনী সমুদ্রের তলদেশে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান কখনোই সরাসরি প্রথাগত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করার পরিকল্পনা করেনি। বরং তাদের কৌশল হলো ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’, যা যুদ্ধকে অনির্দিষ্টকাল টেনে নিয়ে যাবে এবং ইসরায়েল ও ট্রাম্প প্রশাসনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবে।

ইরান তাদের লড়াইকে কেবল নিজের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ‘ওয়ারস অব অ্যাম্বিশন’-এর লেখক আফশোন ওস্তোভার বলেন, “তাদের প্রতিক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হলো এই যুদ্ধের যন্ত্রণা ও অসুবিধা বিশ্বের যত বেশি সম্ভব দেশে ছড়িয়ে দেওয়া।”

শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা ও সাধারণ মানুষের মূল্য

শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা এখন ইরানের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন। ফলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল সরিয়ে নেতারা এখন ঐক্যবদ্ধ। তবে সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে চরম মূল্য। ১ হাজার ৩০০-এর বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন এবং শহরের বাসিন্দারা আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও সামরিক বিশেষজ্ঞ সাঈদ গোলকার বলেন, “সরকার যদি টিকে থাকে, তবে দেশ যত ধ্বংসই হোক না কেন, তারা বিজয় দাবি করবে।”

অতীতের যুদ্ধগুলোও মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ১৯৮২ সালে ইসরায়েল যখন লেবানন আক্রমণ করে, তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থা (পিএলও)-কে তাড়িয়ে দিলেই ‘বিপ্লব ও সহিংসতার অবকাঠামো’ ভেঙে যাবে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই জন্ম নেয় হিজবুল্লাহ, যারা আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে ইসরায়েলি বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে দেয়।

একইভাবে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের আগে নেতানিয়াহু মার্কিন কংগ্রেসে গ্যারান্টি দিয়েছিলেন যে সাদ্দাম হোসেনকে সরালে অঞ্চলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। অথচ সেই যুদ্ধে ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা এবং হাজার হাজার ইরাকি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়, যার ফলশ্রুতিতে জন্ম নেয় আইএস (ইসলামিক স্টেট) এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব আরও বেড়ে যায়।

ইসরায়েলি বিশ্লেষকের মন্তব্য

ইসরায়েলি বিশ্লেষক এবং সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মাইকেল মিলস্টাইন বলেন, “জনসাধারণের কাছে একটি অতিরঞ্জিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে যে হিজবুল্লাহ প্রায় বাষ্পীভূত হয়ে গেছে, ইরানের হুমকি দূর হয়েছে এবং আরব বিশ্ব ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত জোট গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।” তিনি একে বাস্তবতার চেয়ে ‘কল্পনা’ হিসেবেই বেশি দেখছেন। তার মতে, গাজায় হামাসকে এখনও উচ্ছেদ করা যায়নি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা ইতিহাস থেকে কিছুই না শেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।