৬৬ বছর ধরে মার্কিন অবরোধের মুখে কিউবার সংগ্রাম ও নতুন সংস্কার
মার্কিন অবরোধে কিউবার সংগ্রাম ও সংস্কার

৬৬ বছর ধরে কিউবার মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই

ছোট্ট দেশ কিউবা দীর্ঘ ৬৬ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন ও অবরোধের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার উত্তরাধিকার বহন করে এই দেশটি 'মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু' স্লোগানে আত্মরক্ষায় সচেষ্ট। গত কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনের বিভিন্ন প্রশাসন কিউবাকে দমনের চেষ্টা চালালেও, কিউবানরা তাদের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক চাপ

২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ বেদখল হওয়ার পর কিউবার জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সরবরাহে মার্কিন বাধার কারণে ১৬ ও ১৭ মার্চ ২৯ ঘণ্টার জন্য পুরো দেশে বিদ্যুৎ অচল হয়ে যায়। কিউবার জ্বালানি চাহিদার ৪০ শতাংশ মেটায় মেক্সিকো, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের হুমকির মুখে মেক্সিকোর তেল সরবরাহও বন্ধ হয়ে গেছে।

এই সংকটে স্কুল, হাসপাতাল ও অপারেশন থিয়েটারগুলো চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য শহরে নিতে পারছেন না, এবং ওষুধপথ্যের উৎপাদন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। মার্কিন অবরোধের কারণে কিউবা কারও কাছ থেকে জ্বালানি কিনতে পারছে না, যা দেশটির অর্থনীতিকে চরম সংকটে ফেলেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নতুন অর্থনৈতিক সংস্কারের পদক্ষেপ

চাপের মুখে কিউবার সরকার সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বাস্তবসম্মত সংস্কার শুরু করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রবাসী কিউবানরা এখন দেশে বেসরকারি কোম্পানি খুলে ব্যবসা করার সুযোগ পাবেন। প্রবাসী কিউবানদের বৈদেশিক কোম্পানিগুলোও কিউবার ভেতরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে কিউবায় ব্যবসার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এটি ২০২১ সালের সিদ্ধান্তের চেয়ে আরও অগ্রগতি, যখন শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরীণ নাগরিকদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

সৌরশক্তির দিকে ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য কিউবা সোলার শক্তির দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। চীনের সহায়তায় হাজার হাজার সোলার প্যানেল বসানো হচ্ছে। বর্তমানে কিউবার জ্বালানির ৬ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে আসে, এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে এটিকে ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে আমদানিকৃত খনিজ তেলের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমিয়ে ফেলতে চায় দেশটি।

মার্কিন চাপ ও রাজনৈতিক হুমকি

ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেলকে ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো বা ইরানের আলী খামেনির মতো পরিণতি ভোগ করার হুমকি দিচ্ছে। মার্কিন মিডিয়া দীর্ঘদিন ধরে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুর পর কিউবার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

তবে দক্ষিণ আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য বৃদ্ধি এবং দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থানের মুখে কিউবার পুঁজিতন্ত্রবিরোধী ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটনের প্রধান আপত্তি হলো কিউবা ভূমি বিদেশিদের কাছে বিক্রি করছে না, পুরো অর্থনীতি বাজারের হাতে ছাড়ছে না এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা

কিউবার বিরুদ্ধে প্রায় সাত দশক ধরে চলা অবরোধের সপক্ষে জাতিসংঘের কোনো অনুমোদন নেই। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি অগ্রাহ্য করে এই অবরোধ চালানো হচ্ছে, কিন্তু বিশ্ব সম্প্রদায় এ নিয়ে বেশিরভাগই নীরব। এক কোটি কিউবান নাগরিকের বিরুদ্ধে এই দস্যুতায় উদাসীনতা প্রশ্নবিদ্ধ।

৬৬ বছর ধরে 'মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু' স্লোগান কিউবান জনগোষ্ঠীকে আত্মরক্ষায় সৃজনশীল পথের সন্ধানে রাখার একটি অনন্য উদাহরণ। ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার উত্তরাধিকার আজও কিউবাকে সংগ্রামী করে রেখেছে, এবং নতুন সংস্কার ও বিকল্প জ্বালানি উৎসের মাধ্যমে দেশটি তার অস্তিত্ব রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।