ইরানে যুদ্ধের ১৯তম দিনে ট্রাম্পের সামনে কঠিন প্রশ্ন: ইউরেনিয়াম জব্দে স্থলসেনা মোতায়েন?
ইরানে যুদ্ধে ট্রাম্পের সামনে কঠিন প্রশ্ন: ইউরেনিয়াম জব্দে স্থলসেনা?

ইরানে যুদ্ধের ১৯তম দিনে ট্রাম্পের সামনে কঠিন প্রশ্ন: ইউরেনিয়াম জব্দে স্থলসেনা মোতায়েন?

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ১৯তম দিনে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন, যা তার শাসনামলের গতিপথ নির্ধারণ করে দিতে পারে। প্রশ্নটি হলো, তেহরানের হাতে থাকা প্রায় ৯৭০ পাউন্ড সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করতে তিনি কি ইরানে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েন করবেন? এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে ইরান অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে সক্ষম বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।

ট্রাম্পের লক্ষ্য ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরুর পেছনে বিভিন্ন সময়ে একাধিক কারণ দেখালেও একটি বিষয়ে তিনি অনড়। আর তা হলো, ইসরায়েলের সঙ্গে এই সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার প্রধান লক্ষ্য হলো ইরান যেন ‘কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র’ হাতে না পায়। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি কতদূর যেতে রাজি, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত লুকোছাপা রয়েই গেছে। ধারণা করা হয়, অধিকাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বর্তমানে একটি পাহাড়ি স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। গত জুনে ট্রাম্পের নির্দেশে চালানো মার্কিন বোমাবর্ষণে ওই স্থাপনাটি বিধ্বস্ত হয়েছিল। ট্রাম্প তখন দাবি করেছিলেন, ওই হামলায় তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়ে গেছে।

তবে পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল একটি কাজ। বড় ধরনের স্থলসেনা মোতায়েন ছাড়া এটি করা প্রায় অসম্ভব। এটি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবেও চরম অস্বস্তিকর। কারণ তিনি বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের কোনও দীর্ঘমেয়াদী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে তিনি আমেরিকাকে জড়াবেন না। অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ শেষে যদি ইরানে কট্টরপন্থিরা ক্ষমতায় টিকে থাকে, তবে ভবিষ্যতে ইসরায়েল ও আমেরিকার আক্রমণ ঠেকাতে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে আগের চেয়েও বেশি মরিয়া হয়ে উঠবে। সেক্ষেত্রে এই ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ন্ত্রণ করা ওয়াশিংটনের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞ মতামত

প্রেসিডেন্টের এই ‘অগোছালো ও বিশৃঙ্খল’ লক্ষ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল। সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির এই সদস্য বলেন, কিছু লক্ষ্য সশরীরে উপস্থিতি ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়, ইউরেনিয়াম নিরাপদ করা তার মধ্যে অন্যতম। অন্যদিকে, ট্রাম্পের রিপাবলিকান মিত্ররা দাবি করছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে পরিকল্পনা টেবিলে আছে। তবে সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটির চেয়ারম্যান জেমস রিশ এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। রিপাবলিকান সিনেটর রিক স্কট স্বীকার করেছেন যে, স্থলসেনা ছাড়া কীভাবে এটি করা সম্ভব সে বিষয়ে তাকে এখন পর্যন্ত কোনও ব্রিফিং দেওয়া হয়নি। তবে তিনি মনে করেন, এই মজুত সেখানে ফেলে রাখা ঠিক হবে না।

শত শত মানুষের মৃত্যু এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এক প্রকার রহস্যময় নীরবতা পালন করছে। গত সপ্তাহে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, আমি ওসব নিয়ে কথা বলব না। তবে আমরা ইতিহাসে যেকোনও দেশের চেয়ে তাদের ওপর বেশি কঠোর আঘাত করেছি এবং আমরা এখনও থামিনি। পরে কেনটাকিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, ইরানের এখন আর কোনও ‘পারমাণবিক সম্ভাবনা’ নেই। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কতদূর যাবে তা আগেভাগে জানানোর কোনও প্রয়োজন নেই, তবে তাদের হাতে অবশ্যই ‘বিকল্প’ রয়েছে।

ইউরেনিয়াম জব্দের সম্ভাবনা ও জটিলতা

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইরানের গণবিধ্বংসী অস্ত্ররোধী শাখার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রিচার্ড গোল্ডবার্গ বলেন, ইউরেনিয়াম জব্দ করে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব। যদি আকাশপথ পুরোপুরি আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সদস্যরা সেখানে গিয়ে কাজ শেষ করতে পারবে। তবে এটি ওসামা বিন লাদেন বা ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোকে ধরার মতো কোনও ‘বিদ্যুৎ গতির’ অভিযান হবে না। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ইউরেনিয়ামের ক্যানিস্টারগুলো বের করতে ভারী নির্মাণ যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হবে, যা পুরো বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলবে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তাদের ধারণা সমৃদ্ধ ইউরিয়াম এখনও ইরানের ইস্পাহান, নাতাঞ্জ এবং ফোরদো স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচেই রয়ে গেছে। অন্যদিকে, ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স তুলসি গ্যাবার্ড গত বুধবার সিনেটে জানান, মার্কিন হামলায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বিধ্বস্ত হয়েছে। ইরান এটি পুনরায় চালুর চেষ্টা করছে কি না, তা ওয়াশিংটন পর্যবেক্ষণ করছে, তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি।

কেটো ইনস্টিটিউটের ফরেন পলিসি ফেলো ব্র্যান্ডান বাকের মতে, প্রতিটি স্থাপনা থেকে ইউরেনিয়াম সরাতে কমপক্ষে এক হাজার সেনার প্রয়োজন হবে এবং এটি অনেক সময়ের ব্যাপার। তিনি বলেন, ট্রাম্প এখন শাঁখের করাতের মধ্যে আছেন। তিনি সর্বোচ্চ লক্ষ্য অর্জন করতে চান, কিন্তু খরচ কমাতে গিয়ে নূন্যতম প্রচেষ্টায় তা সারতে চাইছেন। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।