ইসরায়েল-ইরান সংঘাতে সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ঝুঁকি
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্স জ্বলছে। বুধবার বুশেহর প্রদেশে এই হামলার পর ইরান পাল্টা জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের চার দেশে সাতটি জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হামলার জেরে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি স্থাপনায় হামলা ও উত্তপ্ত প্রতিক্রিয়া
জ্বালানি স্থাপনা আক্রান্ত হওয়ার পর ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যদি আবারও ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের জ্বালানি স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত’ হামলা চলবে। এদিকে সৌদি আরব হামলা বন্ধ না হলে ইরানে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে। কাতার বলেছে, এসব হামলার মাধ্যমে তেহরান ‘চূড়ান্ত সীমা’ অতিক্রম করেছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের হামলাকে ‘মারাত্মক উসকানিমূলক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
আঞ্চলিক নেতাদের আলোচনা ও সতর্কতা
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলেছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। এ ছাড়া যুদ্ধ গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে সতর্ক করেছেন কাতার সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।
মার্কিন ও ইসরায়েলি অবস্থান
ইসরায়েল ‘ক্ষোভ’ থেকে ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েল সেখানে আর হামলা চালাবে না মন্তব্য করলেও ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যদি জ্বালানি স্থাপনায় আবার হামলা চালায়, তাহলে সাউথ পার্স ‘ধ্বংস’ করে দেওয়া হবে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরানে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অপরিবর্তিত রয়েছে এবং ‘মিশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত’ সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।
জাতিসংঘের আহ্বান ও চলমান সংঘাত
জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলার পর যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি আবারও আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলকে বলছি, এ যুদ্ধ বন্ধ করার এখনই উপযুক্ত সময়। কারণ, যুদ্ধ পুরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। ইরানকে বলছি, আপনার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করুন।’
গতকাল যুদ্ধের ২০তম দিনে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রথমবারের মতো কাস্পিয়ান সাগরে থাকা ইরানি নৌবাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছে ইসরায়েল। ইরানের তাবরিজ শহরে ইসরায়েলের হামলায় চারজন তায়কোয়ান্দো অ্যাথলেট নিহত হয়েছেন। জবাবে ইরান ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইসরায়েলের তেল আবিবে একটি বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাইফায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর ইসরায়েলের একটি তেল শোধনাগারে আগুন লাগে। এসব হামলার কারণে গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্নভাবে আহত হয়ে ১৭৭ জন ইসরায়েলি চিকিৎসা নিয়েছেন। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীও ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন হামলার কথা জানিয়েছে।
আরব দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ও হামলার বিবরণ
গতকাল ইরানের ছোড়া ৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৫টি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে আরব আমিরাত। ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে সৌদি আরবও। কাতার ও বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার খবর পাওয়া গেছে। দেশ দুটি নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার পরামর্শ দিয়েছে।
সাউথ পার্সে হামলার পরই তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুমকি দেয়। এরপর বুধবার দিবাগত রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কুয়েতের দুটি, সৌদি আরবের একটি, আমিরাতের দুটি ও কাতারের একটি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হামলাটি হয়েছে কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে। বৈশ্বিক এলএনজি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশই আসে কাতার থেকে।
গতকাল ভোরে কাতার জানায়, দেশটির প্রধান গ্যাস স্থাপনা রাস লাফানে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে। এতে ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষতি’ হয়েছে স্থাপনাটির। এর প্রতিক্রিয়ায় কাতারে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস থেকে তেহরানের নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের কাতার ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কুয়েতের দুটি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা করেছে ইরান। এর মধ্যে একটি মিনা আল-আহমাদি রিফাইনারি। কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানায়, কুয়েত সিটি থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত তেল শোধনাগারটিতে ড্রোনের আঘাতে আগুন লাগে। এ ছাড়া দেশটির মিনা আবদুল্লাহ রিফাইনারিতেও হামলা হয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত এই তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার সেখানেও আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
হামলা হয়েছে আমিরাতের হাবশান গ্যাসক্ষেত্র ও বাব তেলক্ষেত্রেও। দেশটির সরকার জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করলেও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে জ্বালানি স্থাপনা দুটির ক্ষতি হয়েছে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি।
সৌদি আরবের সামরেফ রিফাইনারিতে আঘাত হেনেছে ড্রোন। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল জানায়, ইয়ানবু বন্দরে সৌদি আরামকোর অধীন তেল শোধনাগারটিতে একটি ড্রোন আছড়ে পড়ে। হামলায় কেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিশ্লেষকদের মতামত ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সব জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বিপজ্জনক এক মোড় নিয়েছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর রাশিয়া, ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া স্টাডিজের পরিচালক থেরেসা ফ্যালন। তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘এর অর্থনৈতিক প্রভাব বহু বছর ধরে পড়বে।’
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদ রেজা আজিজি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘গ্যাসক্ষেত্রে হামলার প্রতিশোধ নিতে বড় পরিসরে ইরানের হামলায় বোঝা যাচ্ছে, দেশটি কৌশলগত চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনেছে। শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত স্থাপনা নিশানা করছে তারা।’
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ঝুঁকি
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হওয়ায় পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব দেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির এক বড় অংশই আসে কাতার থেকে। কাতারের প্রায় সব প্রাকৃতিক গ্যাস রাস লাফানে প্রক্রিয়াজাত ও সেখান থেকে রপ্তানি করা হয়।
জ্বালানি খাতের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর মতে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তাদের এলএনজি আমদানির যথাক্রমে ৯৯ শতাংশ ও ৭০ শতাংশ পায় কাতার থেকে। অন্যদিকে বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারত তাদের এলএনজি চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি কাতার থেকে সংগ্রহ করে।
এসব হামলার জেরে দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান ভার্ড্যান্ট-এর সহপরিচালক জেমস মিডওয়ে। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার পাশাপাশি এখন তেল ও গ্যাসের, বিশেষ করে গ্যাসের উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। তাই এখন আমার মনে হচ্ছে, এতে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।’



