ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে জ্বালানি সংকট: ইউরোপ ও জাপানের যৌথ পদক্ষেপের ঘোষণা
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে জ্বালানি সংকট: ইউরোপ-জাপানের পদক্ষেপ

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে জ্বালানি সংকট: ইউরোপ ও জাপানের যৌথ পদক্ষেপের ঘোষণা

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে একের পর এক হামলায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে বাজার স্থিতিশীল করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে ‘উপযুক্ত পদক্ষেপ’ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপের বেশ কিছু দেশ ও জাপান। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর নিশ্চিত করেছে।

যৌথ বিবৃতিতে ইউরোপ ও জাপানের প্রস্তুতি

বৃহস্পতিবার ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস এবং জাপানের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে তাদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তবে এই ‘পদক্ষেপ’ বা ‘প্রচেষ্টা’ ঠিক কী ধরনের হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। নেতারা অবিলম্বে তেল ও গ্যাস স্থাপনাসহ সব ধরনের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা বন্ধের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজার টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ হয় যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে, ইরানের হামলায় তা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা গত সপ্তাহে তাদের ইতিহাসের বৃহত্তম জরুরি তেল মজুত বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, উৎপাদন বাড়ানোর জন্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গেও কাজ করছে এই রাষ্ট্রগুলো।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূমিকা ও ন্যাটোর সমালোচনা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে একটি নৌ-জোট গঠনের যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, ইউরোপীয় নেতারা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে ট্রাম্পের পূর্বনির্ধারিত বৈঠকের আগে এই যৌথ বিবৃতিটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে ন্যাটো ব্যর্থ হয়েছে। জাপানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জাপান এই দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসছে, কিন্তু ন্যাটো তা করছে না। জাপানের ‘অসামান্য’ সমর্থনের প্রশংসা করে তিনি দেশটিকে এই প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন।

জাপানের ভূমিকা ও সংবিধানগত সীমাবদ্ধতা

জাপান তাদের অপরিশোধিত তেলের ৯৫ শতাংশই পায় এই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, জাপান অবশ্যই তাদের সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা চাইবে। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি জাপানের শান্তিবাদী সংবিধান সংশোধনের চেষ্টা করলেও দেশের ভেতরে এই যুদ্ধ জনপ্রিয় না হওয়ায় তিনি এখনও হরমুজ প্রণালি সচল করতে সরাসরি সামরিক সহায়তার প্রস্তাব দেননি। তিনি জানিয়েছেন, সংবিধানের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে জাপান কী করতে পারে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ইরানের হামলা ও কাতারের এলএনজি কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত

এর আগে, বুধবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি কেন্দ্র কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান এই হামলা চালায়। কাতারএনার্জি জানিয়েছে, এই হামলায় তাদের এলএনজি রফতানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জাসিম আল থানি ইরানের এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার যে দাবি ইরান করছে, তা অগ্রহণযোগ্য ও অযৌক্তিক। এই হামলা প্রমাণ করে যে তারা কাতারের তথা সারা বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।

বিশ্ববাজারে দামের চিত্র ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৩ ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি। অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা ভারড্যান্ট-এর সহ-পরিচালক জেমস মিডওয়ে বলেন, এটি কোনও সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি নয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি এখন তেল ও গ্যাসের মূল উৎপাদনেই বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে এই উচ্চমূল্য দীর্ঘ সময় স্থায়ী হতে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান নিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, এই অপারেশন পরিকল্পিত সময়ের চেয়েও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে তিনি নতুন করে কোথাও কোনও স্থল সেনা মোতায়েন করতে যাচ্ছেন না। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তার পুরনো দাবির পুনরাবৃত্তি করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যেকোনও সময় ইরানের খার্গ দ্বীপ দখল করে নিতে পারে। উল্লেখ্য, পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত এই ছোট দ্বীপটি ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল রফতানির ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।