রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চতুর্থ বছরে: এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন চতুর্থ বছরে প্রবেশ করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে যুদ্ধের মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, পাশাপাশি মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং রণকৌশলেও আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতার সম্মুখীন, যেখানে রণাঙ্গনে সেনাদের চরম ক্লান্তি, প্রযুক্তির দাপট এবং শান্তি আলোচনার মরীচিকা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
সেনা ক্লান্তি: একটি মানবিক সংকট
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের সাবেক সাংবাদিক এবং বর্তমানে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর সৈনিক কোস্তিয়ান্টিন হনচারভ যুদ্ধের এক নির্মম চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, "আমি এখনও বুঝতে পারছি না কেন এই যুদ্ধ শুরু হলো, কেন চলছে এবং কখন, কী মূল্যে এটি শেষ হবে।" হনচারভের কাছে মৃত্যু এখন প্রাত্যহিক রুটিনে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের শীতে আহত হয়ে রণক্ষেত্র থেকে সরে আসার সময় তার ৩০ সদস্যের প্লাটুনের মাত্র পাঁচজন টিকে ছিলেন, বাকিরা হয় নিহত নয়তো চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন।
তিনি জানান, ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর প্রধান সংকট এখন চরম ক্লান্তি। ফ্রন্ট লাইনের ইউনিটগুলোকে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। পদাতিক বাহিনীর তীব্র সংকটের কারণে এখন রাঁধুনি, গাড়িচালক এমনকি বিমান বিধ্বংসী ইউনিটের সদস্যদেরও ফ্রন্টে পাঠানো হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, তারা হয় মারা যাচ্ছে, নয়তো রণক্ষেত্র ছেড়ে পালাচ্ছে। হনচারভ সতর্ক করে বলেন, একজন পদাতিক সেনা যদি টানা ৬০ দিন ফ্রন্টে থাকে, তবে সে আর কার্যকরী যোদ্ধা থাকে না। এই চাপ মানুষকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
প্রযুক্তির দাপট: ড্রোন যুদ্ধের নতুন যুগ
চতুর্থ বছরে এসে যুদ্ধটি পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। এখন ফ্রন্ট লাইনে সেনা প্রতিস্থাপন করতে হলে মাইলের পর মাইল ‘ডেথ জোন’ পাড়ি দিতে হয়, যেখানে সারাক্ষণ ঘাতক ড্রোন ওড়ে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের এই ড্রোন যুদ্ধ এখন আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইরানের তৈরি ড্রোনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের উদ্ভাবিত ‘ড্রোন ইন্টারসেপ্টর’ বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাও ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেনের সহায়তা চাইছে।
দ্য গার্ডিয়ানের তথ্যমতে, প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এখন ড্রোন বিক্রি নিয়ন্ত্রণে নতুন কঠোর ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিদেশি কোনও প্রতিষ্ঠান যেন সরকারকে বাইপাস করে সরাসরি নির্মাতাদের সঙ্গে কথা বলতে না পারে। সম্প্রতি একটি প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে সতর্কও করা হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ও রাজনৈতিক উত্তেজনা
এই যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রকট হয়ে উঠেছে। আল জাজিরার খবর অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা এই পরিস্থিতিতে রাশিয়াকেই সবচেয়ে বড় ‘বিজয়ী’ হিসেবে দেখছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে, যাতে হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ায় পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পৌঁছাতে পারে। এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে জেলেনস্কি প্রশ্ন তুলেছেন, "কেন ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল পরিবহনের অনুমতি দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, অথচ অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে বলা যায় না যে তারা যেন নিষেধাজ্ঞা না তোলে?"
শান্তি আলোচনা: একটি বিভ্রম
রণক্ষেত্রে সামনের সারিতে থাকা সেনাদের কাছে ‘শান্তি আলোচনা’ শব্দ দুটি কেবলই বিভ্রম। হনচারভ লিখেছেন, "পেছনের মানুষের কাছে আলোচনার খবরে মনে হয় যুদ্ধ শেষের পথে। কিন্তু আমাদের কাছে কিছুই বদলায় না। কামান দাগে, ড্রোন ওড়ে, মানুষ মরে।" জেলেনস্কি পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন ও মস্কোর দিকে তাকিয়ে আছেন। যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকের প্রস্তাব দিলেও রাশিয়া এখন পর্যন্ত কোনও প্রতিনিধি পাঠাতে রাজি হয়নি। জেলেনস্কি বলেন, "আমরা এখন মার্কিনীদের কাছ থেকে জবাবের অপেক্ষায় আছি।"
ভবিষ্যৎ: অনিশ্চয়তা ও হাহাকার
যুদ্ধের ১ হাজার ৪৮২তম দিন পেরিয়ে ইউক্রেনের অবস্থান ক্রমশ কঠিনতর হচ্ছে। একদিকে সেনা সংকট, অন্যদিকে ড্রোন প্রযুক্তির নতুন দফার লড়াই। অস্কারজয়ী তথ্যচিত্র ‘মি. নোবডি অ্যাগেইনস্ট পুতিন’ রাশিয়ার ভেতরে চলমান নীরব প্রতিরোধের গল্প বললেও, রণক্ষেত্রের বাস্তবতা ভিন্ন। হনচারভ তার বক্তব্য শেষ করেছেন এক বুক হাহাকার নিয়ে। তিনি বলেন, "আমি সত্যিই চাই আমি ভুল প্রমাণিত হই। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিবারের কাছে ফিরতে চাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই লড়াই আরও অনেক দিন চলবে।"
সূত্র: ডিডব্লিউ, আল জাজিরা, বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান
