ইসরায়েলের টার্গেটেড হামলায় ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত
গত শুক্রবার তেহরানের কেন্দ্রস্থলে আলী লারিজানিকে কালো কোট ও রোদচশমা পরে সমর্থকদের মিছিলে আত্মবিশ্বাসীভাবে হাঁটতে দেখা গিয়েছিল। যুদ্ধের ময়দানে তিনি ইসরায়েলের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিলেন, তা জেনেও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছিলেন, ‘সাহসী জনগণ, সাহসী কর্মকর্তা, সাহসী নেতা–এই সমন্বয়কে পরাজিত করা অসম্ভব।’ কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস স্থায়ী হলো মাত্র চার দিন।
গোপন আস্তানায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
গত মঙ্গলবার ভোরে তেহরানের উপকণ্ঠে এক গোপন আস্তানায় অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক চলাকালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন ইরানের এই শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা। লারিজানি নিহত হওয়ার সেই রাতেই ইসরায়েলি গোয়েন্দারা সাধারণ ইরানিদের কাছ থেকে খবর পায় যে, বাসিজ মিলিশিয়ার কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানি তেহরানের একটি বনাঞ্চলে তাঁবু খাটিয়ে লুকিয়ে আছেন।
গত দুই সপ্তাহ ধরে বাসিজ সদরদপ্তর ও কমান্ড পোস্টগুলোতে ক্রমাগত হামলার ফলে মিলিশিয়া সদস্যরা খোলা জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। সেই সুযোগেই সোলাইমানিকেও ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয়। এর একদিন পরেই ইসরায়েল ঘোষণা দেয় যে, ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খাতিবও নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলের পরিকল্পিত অভিযান
ইসরায়েলি ও মার্কিন নেতাদের মতে, এই যুদ্ধের লক্ষ্যই হলো ইরানি জনগণকে তাদের শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন নথিপত্র এবং লক্ষ্যবস্তুর তালিকা থেকে জানা গেছে, ইসরায়েল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
সদরদপ্তর থেকে শুরু করে ব্রিজের নিচে লুকিয়ে থাকা আস্তানা, কোথাও রেহাই পাচ্ছে না তারা। ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তারা প্রায় ১০ হাজার গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে ২ হাজার ২০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তু ছিল আইআরজিসি এবং বাসিজ মিলিশিয়া সংশ্লিষ্ট।
আজাদি স্টেডিয়ামে বড় হামলা
আজাদি স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন স্পোর্টস কমপ্লেক্সে যখন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জড়ো হয়েছিল, তখন সেখানে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়। এতে শত শত নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তেহরানের এক চিকিৎসক জানান, আহত নিরাপত্তা কর্মীদের জায়গা দিতে গান্ধী হাসপাতালের রোগীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মোসাদের হুমকি ও পুলিশের আতঙ্ক
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এখন সরাসরি ইরানি কমান্ডারদের ফোন করে হুমকি দিচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি অডিও রেকর্ড পর্যালোচনা করেছে, যেখানে এক মোসাদ এজেন্টকে ফার্সি ভাষায় এক পুলিশ কমান্ডারকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা তোমার সম্পর্কে সব জানি। তুমি আমাদের ব্ল্যাকলিস্টে আছো। যদি জনগণের পাশে না দাঁড়াও, তবে তোমার নেতার মতোই পরিণতি হবে।’
জবাবে ভীতসন্ত্রস্ত কমান্ডারকে বলতে শোনা যায়, ‘ভাই, কোরআনের কসম, আমি আপনাদের শত্রু নই। আমি এমনিতেই মৃত মানুষ। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন।’ তেহরানের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হামলার ভয়ে পুলিশ সদস্যরা এখন থানায় না থেকে মসজিদে, গাড়িতে বা বাসের ভেতরে রাত কাটাচ্ছেন।
অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক ভবনে তারা লুকিয়ে থাকছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষ হামলার ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। এমনকি চুরির মামলা বা সাধারণ পুলিশি সেবাও এখন পুরোপুরি বন্ধ। এক দোকানদার বলেন, ‘পুলিশ আমাদের অন্ধকার হওয়ার আগেই দোকান বন্ধ করতে বলেছে, কারণ তারা আমাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।’
বিশ্লেষকদের সতর্কতা
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ফারজিন নাদিমি সতর্ক করে বলেছেন, ‘কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে একটি সরকারকে উৎখাত করা কঠিন। যদি এই শাসনব্যবস্থা টিকে যায়, তবে তারা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।’
এতকিছুর পরেও ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী এখনও রাজপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং বিক্ষোভকারীদের দেখামাত্র গুলির হুমকি দিচ্ছে। অনেক ইরানি মনে করেন, এই মুহূর্তে রাজপথে নামা হবে আত্মহত্যার শামিল। তবে ইসরায়েলি নিরাপত্তা মহলের বিশ্বাস, ভঙ্গুর অর্থনীতি আর জনগণের ক্ষোভ ইরানকে এমন এক পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে যা আর ঠেকানো সম্ভব নয়।
