যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কাউন্টার-টেররিজম কর্মকর্তা জো কেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে লেখা তার পদত্যাগপত্রের একটি অনুলিপি প্রকাশ করেন, যা প্রশাসনের ভেতর থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পদত্যাগপত্রে গুরুতর অভিযোগ
পদত্যাগপত্রে কেন্ট লিখেছেন, ‘আমি সজ্ঞানে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান এই যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারছি না। ইরান আমাদের জাতির জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না। এটি স্পষ্ট যে ইসরাইল এবং তাদের শক্তিশালী আমেরিকান লবির চাপে আমরা এই যুদ্ধ শুরু করেছি।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইরানের হুমকি নিয়ে ট্রাম্পকে ভুল বোঝানো হয়েছে এবং সংবাদমাধ্যমের একাংশ, উচ্চপদস্থ ইসরাইলি কর্মকর্তা ও লবিস্টরা এর জন্য দায়ী।
কে এই জো কেন্ট?
৪৫ বছর বয়সী কেন্ট একজন সাবেক সেনা সদস্য, যিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সে কাজ করেছেন এবং ইরাক যুদ্ধসহ মোট ১১ বার যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছেন। সামরিক বাহিনী ছাড়ার পর তিনি সিআইএতে প্যারামিলিটারি অফিসার হিসেবে কাজ করেন এবং পরে রাজনীতিতে যোগ দেন। তার প্রথম স্ত্রী শ্যানন কেন্ট ২০১৯ সালে সিরিয়ায় এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন এবং কেন্টের দুই সন্তান রয়েছে।
রাজনৈতিক পটভূমি
রাজনীতিতে কেন্ট রিপাবলিকান পার্টি থেকে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে দুইবার (২০২২ ও ২০২৪) কংগ্রেস নির্বাচনে লড়েন, কিন্তু দুবারই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মারি গ্লুয়েসেনক্যাম্প পেরেজের কাছে পরাজিত হন। নির্বাচনে ট্রাম্প তাকে সমর্থন দিলেও উগ্র-ডানপন্থী গোষ্ঠী ‘প্রাউড বয়েজ’-এর এক সদস্যকে পরামর্শক ফি দেওয়ার ঘটনায় তিনি বিতর্কে জড়িয়েছিলেন।
ট্রাম্প প্রশাসনে দায়িত্বকাল
জো কেন্ট আট মাসেরও কম সময় ‘ন্যাশনাল কাউন্টার-টেররিজম সেন্টার’-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত জুলাই মাসে সিনেটে ৫২-৪৪ ভোটে তার নিয়োগ নিশ্চিত হয়, যেখানে কেবল রিপাবলিকানরাই তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনে তার সরাসরি বস ছিলেন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড, যিনি কেন্টের নিয়োগের পর তাকে একজন ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
পদত্যাগের কারণ
একজন সামরিক অভিজ্ঞ হিসেবে কেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি ট্রাম্পের সেই বিদেশনীতির সমর্থক ছিলেন যেখানে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কেন্ট দাবি করেন, ইরাক যুদ্ধের মতো ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়ানো উচিত এবং যুদ্ধ একটি ফাঁদ হিসেবে আমেরিকার সম্পদ ও জীবন নষ্ট করছে।
প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক পল কোয়ার্ক বলেন, সাধারণত এমন উচ্চপর্যায়ের পদত্যাগ প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা, তবে কেন্টের এই পদত্যাগ ট্রাম্পের ইরান নীতিতে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ভোটারদের ওপর প্রভাবের দিক থেকে, গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর আট মাসেরও কম সময় বাকি এবং ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে এই প্রতিক্রিয়া নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া
কেন্টের পদত্যাগপত্র রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করেছে। কেউ কেউ এটিকে নীতিগত অবস্থান হিসেবে দেখছেন, আবার অন্যরা তাকে ‘অজ্ঞ’ ও প্রেসিডেন্টের প্রতি ‘অবিশ্বস্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্প কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘আমি সবসময় ভাবতাম সে একজন ভালো মানুষ, কিন্তু সে নিরাপত্তার বিষয়ে দুর্বল।’ হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট কেন্টের দাবিগুলোকে ‘অপমানজনক এবং হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, রক্ষণশীল বিশ্লেষক টাকার কার্লসন কেন্টের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন এবং তাকে সাহসী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রাজনৈতিক প্রভাব
আল জাজিরার প্রতিনিধি মাইক হ্যানা উল্লেখ করেছেন, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ সমর্থকদের মধ্যে কেন্টের ভালো প্রভাব রয়েছে, তাই তার সমালোচনা ট্রাম্পের অনুসারীদের মধ্যে মোহভঙ্গের ইঙ্গিত হতে পারে। কেন্টের পদত্যাগ সরাসরি মার্কিন সামরিক কৌশলে বড় পরিবর্তন না আনলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



