মার্কিন গোয়েন্দারা ধারণা: ইরান সরকার টিকে থাকবে, যুদ্ধে লক্ষ্য অস্পষ্ট
ইরান সরকার টিকে থাকবে, মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা

ইরানে হামলা সত্ত্বেও সরকার টিকে থাকবে: মার্কিন গোয়েন্দাদের বিশ্লেষণ

তেহরানে তেল ডিপোতে বিমান হামলার পর রাতের আকাশ লাল হয়ে উঠেছিল, যা ইরানের ওপর চলমান যুদ্ধের তীব্রতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলা চললেও, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা যে ইরানের বর্তমান সরকার টিকে যেতে পারে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ নেতৃস্থানীয় সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নিহত হওয়া সত্ত্বেও, তারা বিশ্বাস করেন যে ইরান সরকার এখনো নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে অস্পষ্টতা ও অভ্যন্তরীণ প্রভাব

ইতিমধ্যে এই সংঘাত তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে, যেখানে ইরানের সামরিক স্থাপনা ও নৌবাহিনীর সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং কমপক্ষে দুই হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তবুও সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের মতে, বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ধারাবাহিক বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয় যে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কোনো ঝুঁকিতে নেই। বরং, তারা জানিয়েছে যে সরকার ইরানি জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। গোয়েন্দারা এটিও উল্লেখ করেছেন যে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।

হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং ও সিনেটরের বক্তব্য

চলমান সংঘাতে হোয়াইট হাউসের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত একটি ব্রিফিংয়ে অংশ নেন কানেটিকাটের সিনেটর ক্রিস মারফি। পরে তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা বা দেশটিতে জোরপূর্বক সরকার পরিবর্তন আনতে চাইছে না। মারফি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে লেখেন, 'যুদ্ধের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করার বিষয়টি নেই।' ট্রাম্প বারবার একে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দাবি করায় বিষয়টি বিস্ময়কর বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এই মার্কিন সিনেটর আরও জানান, ব্রিফিংয়ে প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে সরকার পরিবর্তনও তাদের লক্ষ্যের তালিকায় নেই। তিনি বলেন, 'অবশ্য আমরা আগে থেকেই জানি যে কেবল বিমান হামলা চালিয়ে তাদের পারমাণবিক সরঞ্জাম নির্মূল করা সম্ভব নয়।'

বিশ্লেষকদের মতামত ও আঞ্চলিক প্রভাব

পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক চিন্তন প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পার্সির মতে, হোয়াইট হাউস কার্যকরভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থার 'অভ্যন্তরীণ ধস' চাইছে। তাঁর মতে, এটি প্রেসিডেন্টের একধরনের কাল্পনিক প্রত্যাশা যে ক্রমাগত সামরিক চাপের ফলে সেখানে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে এবং ইরানি জনগণ তা পূরণে বাধ্য হয়ে এগিয়ে আসবে।

পার্সি উল্লেখ করেন, এ অভিযান ইরানকে ভূরাজনৈতিক দাবার ছক থেকে সরিয়ে দেওয়ার দীর্ঘদিনের ইসরায়েলি আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলে যায়। তবে তাঁর মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এ ধরনের পদক্ষেপের পেছনে বৈধ যুক্তি তুলে ধরতে হিমশিম খাচ্ছে।

ইরানে এই হামলার ধাক্কা উপসাগরীয় অঞ্চলেও পড়েছে, যেখানে আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের এক জ্যেষ্ঠ আরব কর্মকর্তা বলেন, 'তারা (ট্রাম্প প্রশাসন) ইসরায়েলের জন্য এই যুদ্ধ শুরু করেছে এবং এখন আমাদের একাই এসব হামলা মোকাবিলার জন্য ফেলে রেখে গেছে।'

এদিকে, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইরানের হামলাকে 'বিস্ময়কর' বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। যদিও মার্কিন কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সূত্র দাবি করে যে ইরানে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা হতে পারে—এমন সতর্কবার্তা আগেই দেওয়া হয়েছিল।