মার্কিন বৃহত্তম রণতরীতে রহস্যময় অগ্নিকাণ্ড: ৬০০ নাবিক বিপাকে, ইরান উত্তেজনায় ব্যাহত যুদ্ধ কার্যক্রম
মার্কিন বৃহত্তম রণতরীতে অগ্নিকাণ্ড: ৬০০ নাবিক বিপাকে

মার্কিন বৃহত্তম রণতরীতে রহস্যময় অগ্নিকাণ্ড: ৬০০ নাবিকের বিপর্যয়কর অবস্থা

যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ও বিশ্বের সর্বাধিক আধুনিক রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড একটি রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই ঘটনায় জাহাজটির প্রায় ৬০০ নাবিক তাদের বিছানা হারিয়েছেন এবং বর্তমানে ডাইনিং টেবিল বা মেঝেতে ঘুমাচ্ছেন। গত সপ্তাহে লন্ড্রি কক্ষে লাগা এই আগুন প্রায় ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে জ্বলেছে, যা নাবিকদের জন্য মারাত্মক অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে।

ইরান উত্তেজনার মধ্যেই ঘটেছে অগ্নিকাণ্ড

এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইরানে আগ্রাসন চালাচ্ছে। মার্কিন যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ ডজনখানেক যুদ্ধবিমান এই যৌথ হামলায় ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকেও এই বহরে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আরব সাগরে পৌঁছানোর আগেই এটি বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাবিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই তথ্য পাওয়া গেছে। অগ্নিকাণ্ডের ফলে কয়েক ডজন সেনাসদস্য ধোঁয়াজনিত শ্বাসকষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, যদিও মার্কিন নৌবাহিনী দাবি করেছে যে দুজন নাবিক আহত হলেও তাদের আঘাত গুরুতর নয়।

নৌবাহিনীর বিবৃতি বনাম বাস্তবতা

মার্কিন নৌবাহিনী একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে যে লন্ড্রি কক্ষের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং এটি কোনো যুদ্ধকালীন আক্রমণের ফল নয়। তারা আরও দাবি করেছে যে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে লোহিত সাগরে মোতায়েন থাকা এই ১ লাখ টন ওজনের রণতরীর যুদ্ধকালীন কার্যক্রম ব্যাহত হয়নি।

তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই রণতরীতে লন্ড্রি ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় অনেক নাবিক কাপড় পরিষ্কার করতে পারছেন না। প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ক্রু ও এয়ার উইং সদস্যদের অবস্থা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা ও রেকর্ড মোতায়েন

ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের বর্তমান মোতায়েনের ১০ মাস পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে জাহাজটি নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল, যার মধ্যে টয়লেট বা শৌচাগারের সমস্যা অন্যতম। গত জানুয়ারিতে এনপিআর প্রথম এই সমস্যার কথা জানিয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে জাহাজটির প্লাম্বিং সমস্যার সমাধানে কয়েক ডজন বার বাইরের সাহায্য নিতে হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১২ বার সাহায্য নেওয়া হয়েছে বর্তমান মোতায়েন চলাকালীন।

জাহাজটি গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার নরফোক বন্দর ছাড়ার পর আটলান্টিক পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরে যায়। সেখান থেকে পুনরায় আটলান্টিক হয়ে ভেনিজুয়েলা অভিযানে সহায়তা করতে ক্যারিবীয় অঞ্চলে এবং বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, জেরাল্ড আর ফোর্ডের বর্তমান মোতায়েন যদি আগামী এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তবে এটি হবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর দীর্ঘতম সময় ধরে মোতায়েন থাকার রেকর্ড।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সিএনএনের পক্ষ থেকে পঞ্চম নৌবহরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে এই নৌবহর। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই ঘটনাকে মার্কিন নৌশক্তির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন, বিশেষ করে ইরান উত্তেজনার এই সংকটময় সময়ে।

এই অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখনও রহস্যাবৃত্ত। মার্কিন কর্তৃপক্ষ একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস দিলেও, নাবিকদের বিপর্যস্ত অবস্থা ও জাহাজের অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বের সর্বাধিক প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর এই রণতরীর এমন বিপর্যয় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।