ইরানের শাহেদ ড্রোন: যুদ্ধক্ষেত্রে আতঙ্কের নতুন নাম
ইরানের নকশা করা শাহেদ ড্রোন বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধে এক বড় আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। সাশ্রয়ী অথচ অত্যন্ত মরণঘাতী এই ড্রোনগুলো আধুনিক জ্যামিং-প্রতিরোধী প্রযুক্তির কারণে প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্রিটেনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) গবেষকদের মতে, এই ড্রোনগুলো ওড়ার পর কিছুক্ষণ জিপিএস ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান নির্ণয় করে নেয় এবং এরপর রিসিভার বন্ধ করে দেয়। ফলে জ্যামিং করা এলাকায় জিপিএস কাজ না করলেও ড্রোনগুলো তাদের নিজস্ব ‘ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম’ বা জাইরোস্কোপ ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত শাহেদ ধাঁচের ড্রোনগুলোতে বর্তমানে অত্যন্ত উন্নত ‘অ্যান্টেনা ইন্টারফারেন্স সাপ্রেশন’ প্রযুক্তি দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সার্ভে জানিয়েছে, এই বিশেষ অ্যান্টেনা শত্রুর জ্যামিং সিগন্যাল সরিয়ে দিয়ে প্রয়োজনীয় জিপিএস সিগন্যাল সচল রাখতে সক্ষম। এমনকি সাধারণ বাজারে পাওয়া যায় এমন যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি হলেও এসব ড্রোনের সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জিপিএস সরঞ্জামের কাছাকাছি।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শাহেদ ড্রোনগুলো প্লাস্টিক ও ফাইবারগ্লাসের মতো হালকা উপকরণ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এগুলো রাডার ফাঁকি দিতে পারে। এছাড়া আকারে ছোট হওয়া এবং খুব নিচু দিয়ে ওড়ার ক্ষমতার কারণে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় একে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। বর্তমানে রাশিয়া ও ইরান জিপিএসের বিকল্প হিসেবে চীনের ‘বেইদো’ এবং রাশিয়ার ‘গ্লোনাস’ পজিশনিং সিস্টেমও ব্যবহার করছে, যা জ্যামিং এড়িয়ে চলা আরও সহজ করে দিচ্ছে।
প্রতিরোধের কৌশল
যুদ্ধক্ষেত্রে এই ড্রোন ঠেকাতে বর্তমানে কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল লেজার প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে ইউক্রেনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বলছে, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা ড্রোনের নেভিগেশন সিস্টেম হ্যাক করার মাধ্যমে গন্তব্য বদলে দেওয়ার কৌশল বা ‘স্পুফিং’ পদ্ধতি বেশ কার্যকর। গত বছরের মে থেকে জুলাই মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউক্রেনীয় বাহিনী গুলি করে ড্রোন নামানোর প্রায় কাছাকাছি সংখ্যায় ড্রোন অকেজো করেছে ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে।
আধুনিক এই সমরাস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেবল প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়, বরং প্রযুক্তিগত ও সামরিক কৌশলের সমন্বিত প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও ইরান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের রেডিও নেভিগেশন সিস্টেম ‘লোরান’ পুনরায় সচল করার পরিকল্পনা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা শনাক্ত করা আরও কঠিন হতে পারে। উন্নত প্রযুক্তির এই ড্রোনগুলো তাই সমরাস্ত্র বিশ্বে বর্তমানে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শাহেদ ড্রোনের মতো সাশ্রয়ী ও কার্যকর অস্ত্রের প্রসার ভবিষ্যতে যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিতে পারে। এটি শুধু সামরিক শক্তির ভারসাম্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোতেও নতুন মাত্রা যোগ করছে। ফলে বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
