ইরানের খারগ দ্বীপে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা: তেলের টার্মিনাল লক্ষ্যবস্তু
স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানের খারগ দ্বীপে একটি তেলের টার্মিনাল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, যা পারস্য উপসাগরের একটি কৌশলগত অঞ্চলে অবস্থিত। ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে এই দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা চালানো হয়, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
খারগ দ্বীপ: ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড
বুশেহর প্রদেশের ২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ক্ষুদ্র প্রবালদ্বীপটি ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, বছরে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল এখান থেকে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। দ্বীপটির চারপাশের গভীর পানি বিশাল তেলবাহী জাহাজগুলোর জন্য প্রাকৃতিক সুবিধা প্রদান করে, বিশেষ করে এশিয়ার বাজার যেমন চীনে তেল পাঠানোর ক্ষেত্রে এটি একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে।
হামলার বিবরণ ও ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
শনিবার ভোরে সংঘটিত এই হামলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে তাঁর দেশের বিমানবাহিনী দ্বীপটির সামরিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করেছে। তবে, ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে উল্লেখ করেন, "ভদ্রতার খাতিরে আমি দ্বীপটির জ্বালানি তেল অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।" তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যদি ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়, তবে তিনি এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন।
ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব
খারগ দ্বীপ শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও সমৃদ্ধ। বিখ্যাত ইরানি লেখক জালাল আল-এ-আহমদ একসময় এই নির্জন উপকূলে দাঁড়িয়ে দ্বীপটির নাম দিয়েছিলেন "পারস্য উপসাগরের নিঃসঙ্গ মুক্তা"। দ্বীপটিতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের কঠোর পাহারায় থাকা সত্ত্বেও, এখানে কয়েক হাজার বছরের মানব ইতিহাসের নিদর্শন পাওয়া যায়, যেমন:
- এলানাইট, একিমেনিড এবং সাসানিদ আমলের মানববসতির প্রমাণ
- সপ্তম হিজরি শতকের "মির মোহাম্মদ মাজার" এবং প্রাগৈতিহাসিক আমলের "মির আরাম মাজার"
- প্রাচীন কবরস্থানে জরথুস্ত্রবাদ, খ্রিষ্টান এবং সাসানিদ আমলের সমাধি
- ১৭৪৭ সালের ডাচ দুর্গ, ডাচ বাগান এবং ঐতিহাসিক একিমেনিড শিলালিপি
আধুনিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান এই দ্বীপের তেল প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন দুটি বিশাল ট্যাংক সংস্কারের মাধ্যমে এর ধারণক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ইরানের দৈনিক তেল রপ্তানি ১৬ লাখ ব্যারেলের আশপাশে হলেও, এই টার্মিনালের সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিনে ৭০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত।
দ্বীপটির ইতিহাসে বহু দিগ্বিজয়ী ও ঔপনিবেশিক শক্তির আক্রমণ দেখা গেছে, পর্তুগিজ ও ডাচদের দখল থেকে শুরু করে ১৭৬৬ সালে স্থানীয় বীর মির মুহান্না কর্তৃক ডাচদের বিতাড়ন পর্যন্ত। বিংশ শতাব্দীতে রেজা শাহ পাহলভির শাসনামলে এটি রাজনৈতিক বন্দীদের নির্বাসনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো, এবং ১৯৬০ সালে প্রথম বড় তেলের চালান এখান থেকে যাত্রা করে, যা এর আধুনিক যুগের সূচনা করে।
১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধে এই দ্বীপ ব্যাপক ধ্বংসের শিকার হয়েছিল, কিন্তু পরে ইরান সরকার এটি পুনর্নির্মাণ করে। আজ, খারগ দ্বীপ ইরানের জ্বালানি খাতের স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে, আন্তর্জাতিক উত্তেজনার মধ্যেও এর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম।



