দালালের ফাঁদে পড়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ গেল ময়মনসিংহের তরুণের
দালালের ফাঁদে পড়ে যুদ্ধে প্রাণ গেল ময়মনসিংহের তরুণের

পরিবারের অভাব ঘোচাতে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন ময়মনসিংহের আব্দুর রহিম। স্বজনদের অজান্তে দালালের ফাঁদে পড়ে শেষ পর্যন্ত তাকে যোগ দিতে হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। গত ২ এপ্রিল রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় মৃত্যু হয়েছে এই ৩০ বছর বয়সী তরুণের। খবর পেয়ে তার গ্রামের বাড়িতে এখন শোকের মাতম।

আব্দুর রহিমের পরিচয় ও পরিবার

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের নামাপাড়া গ্রামের আজিজুল হকের বড় ছেলে আব্দুর রহিম। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় এই তরুণের বাবা স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। সামান্য বেতনে বড় সংসার টেনে ছেলেদের লেখাপড়ার খরচ চালানো তার পক্ষে সম্ভব হতো না। রহিম ২০১১ সালে ধামর আফাজিয়া দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল এবং ২০১৪ সালে ফুলবাড়িয়া কেআই সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা থেকে আলিম পাস করেন। এরপর টাঙ্গাইলের সরকারি এম এম আলী কলেজে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হলেও চরম অর্থকষ্টে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

প্রথমবার বিদেশ যাত্রা

ছোট দুই ভাইয়ের লেখাপড়া ও সংসারের অভাব মেটাতে ৬ লাখ টাকা ঋণ করে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান রহিম। প্রায় সাত বছর সেখানে থেকেও তেমন সুবিধা করতে পারেননি। ২০২৩ সালের আগস্টে দেশে ফেরেন। এক বছর দেশে থাকার পর আবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দ্বিতীয়বার বিদেশ যাত্রা ও দালালের ফাঁদ

এরপর তিন লাখ টাকা ঋণ করে এক দালালের মাধ্যমে সিনোপেক কম্পানির ভিসায় ২০২৪ সালের ৭ ডিসেম্বর রাশিয়া যান রহিম। সেখানে একটি শিপে কাজ শুরু করেন। মৃত্যুর পাঁচ মাস আগে দালাল তাকে বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাকরির কথা বলে আরও ৩ লাখ টাকা নেয়, যে টাকা পরিবার জমি বন্ধক দিয়ে জোগাড় করেছিল। নতুন ও পুরোনো কম্পানির বেতন একসঙ্গে পেয়ে গত ১৬ এপ্রিল রহিম বাড়িতে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা জানতেন না যে রহিম আসলে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মৃত্যুর খবর

গত ২৮ এপ্রিল তিনি ছোট ভাইয়ের মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে জানান, কর্মস্থলে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে ফোনে কথা বলা সম্ভব হচ্ছে না, কোনো কথা থাকলে বার্তা পাঠিয়ে রাখতে বলেন। এরপর থেকেই তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। রাশিয়ায় একই ক্যাম্পে রুশ সেনা হিসেবে থাকতেন লিমন দত্ত নামের আরেক যুবক। তিনি গত রোববার রহিমের মেজো ভাই আব্দুর রাজ্জাকের মোবাইলে জানান, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় তার নিজের একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তিনি চিকিৎসাধীন। সেই হামলায় আব্দুর রহিম এবং কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার রিয়াদ নামে আরেকজন নিহত হয়েছেন। রহিমের পরিবার কিশোরগঞ্জে রিয়াদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।

পরিবারের বক্তব্য

নিহতের মেজো ভাই আব্দুর রাজ্জাক জানান, 'প্রথমে ওয়ার্কশপের কাজ নিয়ে রাশিয়া গিয়েছিলেন, এক দালাল নতুন কম্পানিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় যা আমরা জানতাম না। গত ২ এপ্রিল রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় আব্দুর রহিমের মৃত্যু হয়েছে বলে তার বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পেরেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রুশ সেনার পোশাক পরা ও বন্দুক হাতে আব্দুর রহিমসহ ৫ জনের একটি ছবিও দেখতে পাই।' বাবা আজিজুল হক বলেন, 'মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা ও জমি বন্ধক দিয়ে ৬ লাখ টাকা খরচ করে পোলাডারে ওয়েল্ডিংয়ের কাজে প্রবাসে পাঠিয়েছিলাম। পরে বায়ু বিদ্যুৎ কম্পানিতে চাকরির কথা বলে আরো ৩ লাখ টাকা নেয়। রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি জানতাম না। পরে জানতে পারি যুদ্ধে ড্রোন হামলায় মারা গেছে। ছেলের লাশ দেশে আনার জন্য সরকারের কাছে আকুল আবেদন করছি।'

গ্রামের চিত্র ও প্রতিক্রিয়া

মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে নামাপাড়া গ্রামের মুন্সিবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ ছুটে এসেছেন। ভাঙা পুরোনো টিনশেড ঘরের ভেতরে মায়ের আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে আছে। বাইরে বৃদ্ধ বাবা অঝোরে কাঁদছেন। পাশে থাকা নতুন বাড়ি করার জন্য কেনা ইটের স্তূপ যেন অসম্পূর্ণ স্বপ্নের সাক্ষী। শোকগ্রস্ত বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মু. কামরুল হাসান মিলন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ। পরিবারের একটাই আকুতি — ছেলের মরদেহ যেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। প্রতিবেশীরা জানান, রহিম শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিলেন। পরিবারের টানে লেখাপড়া ছেড়ে বিদেশ গিয়েছিলেন। বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় ছোট দুই ভাই আব্দুর রহমান ও আব্দুর রাজ্জাকের পড়াশোনা ও সংসার চলত। এখন পরিবারে উপার্জনক্ষম আর কেউ নেই।

প্রশাসনের পদক্ষেপ

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ জানান, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফরওয়ার্ড করে দ্রুত মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করা হবে। মানবিক সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে পরিবারের পাশে থাকা হবে। দালাল চিহ্নিত হলে সে বিষয়েও আইনগত সহায়তা দেওয়া হবে। সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মু. কামরুল হাসান মিলন বলেন, 'দালালের খপ্পরে পড়ে এই ক্ষতিগুলো হচ্ছে। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি লাশ আনার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া মেনে চলতে হয়। নিহতের লাশ আনতে সর্বোচ্চ সহায়তা করব। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।'