ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির আশা ম্লান হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সাম্প্রতিকতম প্রস্তাবে তেহরানের পাঠানো জবাবকে 'আবর্জনা' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি এখন 'লাইফ সাপোর্টে' রয়েছে। তেহরান যুদ্ধ বন্ধের জন্য যে শর্তগুলো দিয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অগ্রহণযোগ্য।
ইরানের শর্ত কী ছিল?
মার্কিন প্রস্তাবের জবাবে ইরান সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে লেবাননও রয়েছে, যেখানে মার্কিন মিত্র ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইরান–সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এ ছাড়া তেহরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
গত ৭ এপ্রিল শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্প বলেন, 'ইরান আমাদের যে “আবর্জনা” পাঠিয়েছে, তা পড়ার পর আমি বলব, এটি (যুদ্ধবিরতি) এখন সবচেয়ে নড়বড়ে অবস্থায় আছে। আমি সেটি পড়া শেষও করিনি।'
যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ট্রাম্প বারবার এ যুদ্ধবিরতি বাতিলের হুমকি দিয়ে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দিয়েছিল যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিতর্কিত ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনার আগে লড়াই বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল শর্তহীন যুদ্ধবিরতির পর আলোচনা; আর ইরান চেয়েছিল, আগে তাদের শর্ত পূরণ, তারপর যুদ্ধ বন্ধ।
এ উত্তেজনা ও অচলাবস্থার কারণে হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। ফলে আজ মঙ্গলবার এশীয় বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০৪ দশমিক ৫০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
ট্রাম্পের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে
যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা নিয়ে ইরানের আচরণে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমে হতাশ হয়ে পড়ছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় বর্তমানে ট্রাম্প বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকা এবং ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ট্রাম্পের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে। ট্রাম্পের ধারণা, এ বিভক্তির কারণেই ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বড় কোনো সমঝোতায় আসতে পারছে না।
ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবকে ট্রাম্প 'পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য' ও 'নির্বুদ্ধিতা' বলে আখ্যা দেওয়ায় মার্কিন কর্মকর্তাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, তেহরান প্রকৃতপক্ষে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায় কি না।
মার্কিন প্রশাসনে মতভেদ
বর্তমান পরিস্থিতিতে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। পেন্টাগনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে আরও আক্রমণাত্মক হওয়া প্রয়োজন। এর অংশ হিসেবে তাঁরা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পক্ষে মত দিয়েছেন, যা তেহরানের শক্তি কমিয়ে দেবে। তবে প্রশাসনের অন্য একটি পক্ষ এখনো মনে করে, কূটনীতিকে আরও একটু সুযোগ দেওয়া উচিত।
পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের অনেকেই চাইছেন মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান যেন ইরানের সঙ্গে আরও সরাসরি কথা বলে। প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহ করছেন যে ট্রাম্প আলোচনায় যতটা অসন্তোষ প্রকাশ করছেন, পাকিস্তান তা ইরানের কাছে সেভাবে তুলে ধরছে না। এমনকি কোনো কোনো কর্মকর্তার মতে, পাকিস্তান ইরানের অবস্থানকে বাস্তবের চেয়ে বেশি ইতিবাচকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উপস্থাপন করছে।
এক কর্মকর্তা গতকাল সোমবার জানিয়েছেন, পাকিস্তানসহ ওই অঞ্চলের দেশগুলো ইরানকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, ট্রাম্প অত্যন্ত বিরক্ত এবং এটিই তাদের জন্য কূটনীতির শেষ সুযোগ। কিন্তু ইরান কাউকেই গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সমর্থন পেতে হিমশিম
এদিকে আন্তর্জাতিক সমর্থন পেতেও হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটন। ন্যাটো মিত্ররা পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি ছাড়া এ জলপথ খুলে দিতে কোনো জাহাজ পাঠাতে রাজি নয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বললেও কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ছয় মাসেরও কম সময় বাকি। এরই মধ্যে তেলের বাড়তি দামের কারণে ভোটারদের মধ্যে এ যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। একটি সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র কেন এ যুদ্ধে লিপ্ত হলো, তা স্পষ্ট করতে পারেননি ট্রাম্প।
ট্রাম্পের বড় সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা
এ অবস্থায় গতকাল হোয়াইট হাউসে জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে আবারও বৈঠক করেছেন ট্রাম্প। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আজ মঙ্গলবার বিকেলে চীন সফরের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার আগে তাঁর বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কম।
এক কর্মকর্তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই পক্ষই সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতা ও সময়ের হিসাব নিয়ে এগোচ্ছে। তা ছাড়া কয়েক দশক ধরে অর্থনৈতিক চাপ সয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতাও ইরানের রয়েছে।



